রাজধানীজুড়ে ফুটপাত বা ডিভাইডারে যেসব গাছ লাগানো হয় সেগুলোর বেশিরভাগই বেশিদিন টিকে থাকার যোগ্য নয়। এগুলো বড় হলেই হেলে পড়ে। বেড়ে উঠতে গিয়ে সঠিক পুষ্টি আর মাটির অভাবে দুর্বলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ঝড়ো বাতাসের অপেক্ষায়। এমনই একটি গাছ মাথায় পড়ে গত কয়েকদিন আগে নিহত হয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠু। আগের দিন ঝড়ে গাছটির গোড়া দুর্বল হয়ে যায়, পরদিন দুপুরে তা উপড়ে পড়ে রাস্তায়। সে সময় রিকশা করে কাজে যাচ্ছিলেন মিঠু।
রাজধানীতে এভাবে ঝড়ের সময় নিয়মিতই গাছ উপড়ে পড়ে ছোট খাটো দুর্ঘটনা ঘটে। বেশিরভাগ ঘটনাই আমরা জানি না। ঝুঁকিপূর্ণ এসব গাছ চিহ্নিত করা বা সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের কোনও ভূমিকাই নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন গাছ কোথায় লাগানো উচিত এ নিয়ে কারও মতামত নেওয়া হয় না। ফুটপাত ডিভাইডারের গাছ এবং তার পরিচর্যা একেবারেই আলাদা হওয়া জরুরি। আর সিটি করপোরেশন বলছে, গাছ নিয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয় না। তবে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ডিভাইডারে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছে ডিসিসি, রাজউক ও সড়ক বিভাগ। দেড় ফুট চওড়া ডিভাইডারে লম্বা লম্বা শিশু গাছ, ইউক্যালিপটাস, এমনকি বটগাছেরও দেখা মেলে। একেকটির উচ্চতা আনুমানিক তিনতলা পর্যন্ত। এসব গাছের বেশিরভাগেরই ছালবাকল নেই, একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে দেখা যাবে অপার্থিব কোনও উপায়ে দাঁড়িয়ে আছে, গাছের ভেতরে ফাঁপা। অনেক সড়ক দ্বীপেই চোখে পড়ে পাকুড়, মেহগনির মতো বড় গাছের চারা। কিন্তু এসব গাছের চেহারা একেবারেই মলিন।
ফুটপাতের ক্ষেত্রে অবস্থা আরও খারাপ। বেশিরভাগ গাছের জন্য আলাদা করে কোনও জায়গায় রাখা হয়নি। গোড়ার পুরোটাই মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ইট সুড়কিতে। একসময় গাছ প্রতিবাদ করে কনক্রিট ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায় বটে, কিন্তু ততদিনে চলে যায় ভেঙে পড়ার অবস্থায়।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এসব গাছের চারপাশে কমপক্ষে এক মিটার জায়গা রাখা উচিত। এভাবে মুখ পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে কখনোই গাছ বাঁচানো যায় না। আবার কোন গাছ কখন পড়ে যাবে সেটাও বোঝা যাবে না।
রাজধানীর রোকেয়া সরণী, বিজয় সরণী, মানিকমিয়া এভিনিউ, মিন্টুরোড, ধানমন্ডি ১০ থেকে ১০/এ পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন সড়ক, সড়কদ্বীপ, ফুটপাত, রোড ডিভাইডার, উন্মুক্ত স্থানে বৃক্ষ রোপনের ক্ষেত্রে কোনও পরিকল্পনা বা প্রস্তুতির ছাপ নেই। ছোট পরিসরের রোড ডিভাইডারে বড় গাছপালা লাগানো যেখানে উচিত নয়, সেখানে কৃষ্ণচূড়া থেকে শুরু করে পাকুড়, মেহগনি গাছের সারি। একেকটি গাছ তিনতলা সমপরিমান উঁচু হয়ে রাস্তার দিকে ঢলে পড়েছে। কারণ ওই গাছের বৃদ্ধির জন্য যে জায়গা প্রয়োজন তা ডিভাইডারে নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে অপরিসর রোড ডিভাইডারে রোপণ করা হয়েছে কাঁঠাল, বকুল, দেবদারু এমনকি রেইন ট্রির মতো বড় গাছ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সঙ্গে জড়িত নগরবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘কোনও গাছ ঝুঁকিপূর্ণ হলে তা চিহ্নিত করে মানুষকে সতর্ক করা ও যত দ্রুত সম্ভব তা সরিয়ে ফেলা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। আমাদের এখানে যেখানে সেখানে যেকোনওভাবে যেমন রাস্তা বানানো হয়, তেমনই লাগানো হয় গাছও। গাছটা কত বড় হবে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে কিনা এসব নিয়ে কোনও আলাপই নেই। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, কোনটা আমরা জানি, কোনটা জানি না।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘আমার জানা মতে গাছ নিয়ে পরিকল্পিত কিছু করা হয় না। রাস্তার ধারের কোন গাছের কী পরিস্থিতি তা আমরা জানি না। তবে ডিভাইডারের গাছ লাগানোর সময় নানাজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেসব ঠিকমতো মানা হয় কিনা এটা মনিটরিং করা দরকার। গাছ লাগানোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইদানিং প্রায় মাঝারি ধরনের ঝড়েই গাছগুলো ভেঙে পড়ে। এতে যেকোনও দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েই যায়।’
ছবি: প্রতিবেদক ও নাসিরুল ইসলাম।
/ইউআই/এজে/








