সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ সংক্রান্ত বহুল আলোচিত বিষয় হলো– ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল’। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণার ফলে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল আছে নাকি নেই তা নিয়েও দ্বিধান্বিত ছিলেন আইনজ্ঞরা। তবে সবশেষ এ সংক্রান্ত আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদনের মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা ফিরলে বিচারপতিরাও ‘ন্যায়বিচার’ পাবেন বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
বাংলাদেশ সংবিধানের সংশোধনীগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে প্রণীত মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পণ করা হয়। পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয় সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের কাছে। মার্শাল প্রক্লেমেশনে করা পঞ্চম সংশোধনীতে এক্ষেত্রে ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
পরে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ষোড়শ সংশোধনীতে সেটা বাতিল করে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হয় সংসদের হাতে। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
পরে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন। এ রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছরের ৯ নভেম্বর ষোড়শ সংশোধনী কেন অবৈধ, বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট।
দীর্ঘদিন পর রুল শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ৫ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার পর ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি এ বিষয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।
ওই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে সর্বসম্মতিক্রমে চূড়ান্ত রায়টি দেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ। পরবর্তীতে একই বছরের ১ আগস্ট ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়।
তবে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। এরপর কয়েক দফা মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এলেও রিভিউয়ের শুনানি হয়নি।
সবশেষ গত ১০ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি। এদিকে গত ১৬ অক্টোবর ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগের ১২ জন বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এদিন (১৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আজিজ আহমদ ভূঞা বিক্ষোভরত ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি প্রতিনিধি দল আমার সঙ্গে দেখা করেছে। তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আমরা আলোচনা করেছি। পরবর্তী সময়ে এই বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি। বিচারপতিদের পদত্যাগ কিংবা অপসারণের একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই সংক্রান্ত কোনও আইন নেই। বিগত সরকার বিচারপতিদের অপসারণে একটি অ্যামেন্ডমেন্ট নিয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেটি বাতিল করে দেয়। এটি আবারও রিভিউর জন্য সরকার আবেদন করেছে। আগামী রবিবার আদালত খুলবে। এটা নিয়ে ওইদিন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেবেন।’
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এছাড়া বিচারপতিদের পদত্যাগের যে দাবি, এ ক্ষেত্রে- বিচারক নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি, আবার অপসারণও করেন রাষ্ট্রপতি। এখানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির যা করণীয় তিনি তা করেছেন। ইতোমধ্যে ১২ জন বিচারককে বেঞ্চ দেওয়া হচ্ছে না। এর মানে হচ্ছে, ২০ তারিখ তারা বিচারকাজ পরিচালনা করতে পারবেন না। আমরা আশা করছি, ২০ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস বিষয়টি আদালতে উত্থাপন করবে। পর্যায়ক্রমে কী হয় সেটা জানা যাবে।’
এরই ধারাবাহিকতায় আজ রবিবার (২০ অক্টোবর) রিভিউ আবেদনটি সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য এক নম্বর ক্রমিকে রাখা হয়েছে।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক রিভিউ আবেদনটি ফেরত নিলে বা তা খারিজ হলে কী হবে সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার কাছে মনে হয় বিচারপতিদের অভিশংসনের বা তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যে প্রক্রিয়াটি (সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল) বন্ধ ছিল এই রিভিউ পিটিশন নিষ্পত্তির মাধ্যমে তার একটি সুরাহা হবে। আমি মনে করি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সম্পর্কে বিভিন্ন কর্নার থেকে যেভাবে অভিযোগ করা হয়, অনুযোগ করা হয়- তা একটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে।
‘বড় কথা হলো আমাদের সংবিধানে এমন সংশোধনী তো (অভিশংসনের বিষয়টি সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের হাতে) ছিল এবং ইতোপূর্বে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ফাংশনও করেছে। মাঝখানে বিগত অবৈধ সরকার তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে করায়ত্ত করার জন্য উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদকে দিয়েছিল। এর (রিভিউ) মাধ্যমে নতুন করে জুডিসিয়াল কাউন্সিল ফিরে এলে, আমার মনে হয় বিচারপ্রার্থী মানুষের বিচারকরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না, তারাও তাদের সঠিকভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করবে এবং মানুষও ন্যায়বিচার পাবে। একইসঙ্গে সংসদের হাতে নিয়ে গিয়ে একজন নিরপরাধ বিচারপতিকে বিচারের নামে বিদায় করার যে উদ্দেশ্য গত সরকারের করেছিল, সেই আশঙ্কা থেকে বিচারপতিরা মুক্ত হবেন এবং তারা নিঃসংকোচে-নির্ভয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন।
সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সাজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সুপ্রিম কোর্ট সংবিধান সংরক্ষণ আইনজীবীর ব্যানারে বিএনপির আশীর্বাদপুষ্ট আইনজীবী সংগঠন বিচারপতিদের অপসারণের দাবি করেছে। স্বাভাবিকভাবেই কোনও বিষয়ে তদন্ত না করে প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে বিচারপতিদের (১২ জন বিচারপতি) চায়ের দাওয়াত দিয়ে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। যদিও চায়ের দাওয়াত দিয়ে ছুটিতে পাঠানোর বিষয়টি প্রধান বিচারপতির শপথের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, প্রধান বিচারপতি সমস্ত ভয়ভীতি-অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে থেকে কাজটি (ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা) সম্পাদন করবেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই আইন অঙ্গনের বাইরে, বার ও বেঞ্চের দাবির বাইরে থেকে ছাত্র সংগঠনের হুমকির মুখে এ ধরনের দাবি (প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদত্যাগ) আদায় পূরণ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এটা প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক শপথের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এটা সঠিক হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এখন যদি সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল রিস্টোর (ফেরত আসে) করে তাহলে এটার উপর নির্ভর করে তদন্ত হবে, তদন্তে সত্যতা প্রমাণ মিললে সে আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেক্ষেত্রে যার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে সে ডিফেন্স (আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা) করতে পারবে। তলব করা হলে সে তার জবাব দেওয়ারও সুযোগ পাবে। জবাবের আলোকে প্রধান বিচারপতিসহ দুজন সিনিয়র বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি (সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল) তদন্তের প্রমাণের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে স্পষ্ট বার্তা যাবে যে, এটা সঠিকভাবে হয়েছে (অভিশংসন)।
কিন্তু বেআইনি একটি প্রক্রিয়ায় চায়ের দাওয়াতের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যা হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষ এবং আইনজীবীরা বিষয়টি খুব ইতিবাচকভাবে নেয়নি। কারণ, ওই মুহূর্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র সংগঠন এসে এখানে বিষয়টি বিতর্কিত করেছে। এই রিভিউয়ের মাধ্যমে বিচারপতিদেরও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেদিন ছাত্রদের দাবির মুখে বিচারপতিদের ছুটিতে না পাঠিয়ে অন্তত একটি সপ্তাহ অপেক্ষা করলে ভালো হতো। প্রধান বিচারপতির সেদিন বলা উচিত ছিল, যেটি আইনে আছে তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কাউকে জোড় করে ছুটিতে পাঠানো মানেই নিজেকেও সে অবস্থায় পতিত করা, অন্যদেরকেও সেই অবস্থায় পতিত করা। এই ছুটিতে পাঠানোর মাধ্যমে ওই বিচারপতিদের সম্মান তাদের পরিবার ও দেশে-বিদেশে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। যা সঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সাজু।









