জুলাই-আগস্টের গণহত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ পুলিশের বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সে আদেশের ধারাবাহিকতায় রংপুর থেকে ভোরবেলা গ্রেফতারের পর বিকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের সাবেক উপ-কমিশনার (ডিসি) জসিম উদ্দিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ফলে তিনিই প্রথম আসামি ও পুলিশ কর্মকর্তা যাকে পরোয়ানার পর সর্বপ্রথম ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। হাজিরের পর প্রায় ৬ ঘণ্টা তিনি বিমর্ষ এবং কান্নারত অবস্থায় ছিলেন।
বুধবার (৩০ অক্টোবর) বিকাল ৩টা ৩৮ মিনিটে তাকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানার ১২২ নম্বর কক্ষে রাখা হয়। হাজতখানার ভেতরে পায়চারি করছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে হাজতখানার ভেতরে থাকা চেয়ারে বসলেও পুরো সময় তাকে বিমর্ষ দেখা গেছে।
একপর্যায়ে হাজতখানার সামনে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁদতে থাকেন। বারবার টিস্যু দিয়ে মুখ মুছছিলেন পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। এরপর ৪টা ৩২ মিনিটে তাকে ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে নিয়ে আসা হয়। এজলাসের কাঠগড়ায় থাকা চেয়ারে তিনি নিশ্চুপ বসে ছিলেন। বিকাল ৪টা ৪২ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে বিচারপতিরা প্রবেশ করেন। এসময় প্রসিকিউশন টিম উপস্থিত থাকলেও পুলিশ কর্মকর্তা জসিমের পক্ষে কোনও আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
শুনানিকালে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, আজ (বুধবার) রংপুর থেকে ভোরবেলা পুলিশের মিরপুর জোনের সাবেক ডিসি জসিম উদ্দিন মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বাড়ি যেহেতু গোপালগঞ্জে তাই তাকে সেই জেলার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে গ্রেফতার দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পূর্বে যে মামলায় ওয়ারেন্ট ছিল সেই মামলায় তদন্তের স্বার্থে কারাগারে প্রেরণ করা হোক।
তখন বিচারপতিরা বেঞ্চ অফিসারকে কাঠগড়ার কাছে গিয়ে আসামির নাম-পরিচয় যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।
বেঞ্চ অফিসার আসামির কাছে জানতে চান, আপনার নাম জসিম উদ্দিন মোল্লা?
জবাবে তিনি বলেন, আমার নাম মো. জসিম উদ্দিন মোল্লা। এরপর বেঞ্চ অফিসারের প্রশ্ন অনুসারে জসিম উদ্দিন তার পিতা-মাতার নাম ও ঠিকানা জানান।
পরে ট্রাইব্যুনাল ৪টা ৪৭ মিনিটে যথাযথ তদন্তের স্বার্থে আসামি জসিম উদ্দিন মোল্লাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২০ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়।
আদেশের পর ট্রাইব্যুনালের এজলাস থেকে আসামিকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে ট্রাইব্যুনালের বাইরে প্রবেশের মুখে থাকা নিরাপত্তা কক্ষে দুই সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী ও দুই সন্তান।
জানতে চাওয়া হলে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী জানান, তিনি খাবার ও কাপড় নিয়ে দেখা করতে এসেছেন। তাদের তিন সন্তান। বড় ছেলে নবম শ্রেণিতে, ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে এবং একমাত্র মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়েন। তারা ঢাকাতেই থাকেন। গত ৫ আগস্ট মিরপুর থানায় আগুন দেওয়ায় তার স্বামী সেখানে আট ঘণ্টা আটক ছিলেন বলে তিনি কেঁদে ফেলেন। এসময় তার সঙ্গে আসা দুই সন্তানও কাঁদতে থাকে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার পর সকলেই আবেগঘন হয়ে কাঁদতে শুরু করেন। এরপর রাত ৮টা ২২ মিনিটে গণহত্যার অভিযোগের আসামি জসিম উদ্দিন মোল্লা ট্রাইব্যুনালের হাজতখানা থেকে কারাগারে প্রেরণের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরআগে জুলাই-আগস্ট গণহত্যার অভিযোগে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ ১৭ সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৭ অক্টোবর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।
ট্রাইব্যুনালে তাদের হাজিরের নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম। সেদিন শুনানিকালে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে পুলিশের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে উপসচিব মো. মাহবুর রহমান শেখ স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে মো. জসীম উদ্দীনকে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি সেখানেই কর্মরত ছিলেন।









