ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আগের মতো কোটা রেখেই ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে কোটা নির্বাচন করতে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে কোটা সংস্কার বিষয়ে দাবি উঠলে একটি কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু সেটির কার্যক্রম শেষ না হওয়ার আগেই ভর্তি পরীক্ষায় কোটা বহাল রাখা হয়েছে। এটিকে গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটবিরোধী বলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
ভর্তি পরীক্ষায় কোটা সংস্কারের দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এবিএম শফিকুল ইসলাম।
স্মারকলিপিতে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাকাডেমিক কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আপনাকে জানাচ্ছি যে গত ২৭ অক্টোবর অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে এ বছর ২০২৪-২৫ সেশনে আন্ডার-গ্র্যাজুয়েটের ভর্তি সংক্রান্ত আলোচনায় ভর্তি পরীক্ষার্থীদের কোটা বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে ও নাতি-নাতনিদের ভর্তির কোটা নিয়ে সংস্কারের জন্য অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্যরা জোর দাবি তোলেন। বিস্তারিত আলোচনার পর কোটা বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে তা নির্ধারণের জন্য আপনি একটি কমিটি করেন। আশ্চর্যের বিষয়, ২১ অক্টোবর ভর্তি কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে কীভাবে ২৭ অক্টোবর তারিখের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভার সিদ্ধান্ত সন্নিবেশিত হয়? উল্লেখ্য, ওই কমিটির কোনও সভা এবং কোটা সংস্কার ছাড়াই ভর্তির কাজ শুরু হয়েছে, যা আইনবহির্ভূত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবাই জানি জুলাই বিপ্লব শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কার নিয়ে এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আবু সাঈদসহ বহু ছাত্র-জনতা প্রাণ দিয়েছেন এবং অনেক ছাত্র-জনতা এখনও চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের এই ত্যাগের মূল্য দিতে হলে কোটা সংস্কার ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার সজিব বলেন, আমরা কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সেটি মেনে নিতে পারি না। সব জায়গায় কোটার যৌক্তিক সংস্কার করতে হবে। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পোষ্য কোটার মানে হয় না। পোষ্য কোটার মানে হলে রাজার ছেলে রাজা আর প্রজার ছেলে প্রজা। এটি কাঠামোগত তৈরি বৈষম্য। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আহ্বান জানাই, এটি এখনই সংস্কার করুন। অন্যথায় পরিণাম ভালো হবে না।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতি কোটা, পোষ্য কোটা ও খেলোয়াড় কোটা বাতিলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষার আজ (মঙ্গলবার) ই-মেইলে এই নোটিশ পাঠান। ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষার ছাড়া নোটিশদাতারা হলেন ব্যারিস্টার মাহদী জামান (বনি), অ্যাডভোকেট বায়েজীদ হোসাইন, অ্যাডভোকেট শাহেদ সিদ্দিকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি (প্রশাসন), প্রো-ভিসি (শিক্ষা) ও রেজিস্ট্রারকে ই-মেইলে আজ (মঙ্গলবার) এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
নোটিশ পাওয়ার ৫ দিনের মধ্যে (ক) মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ (খ) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং (গ) শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ বহাল রেখে বাকি সব কোটা বাতিল করতে বলা হয়েছে। নোটিশ গ্রহীতারা ব্যবস্থা না নিলে সুপ্রিম কোর্টে রিটসহ বিষয়টি নিয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। নোটিশে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সব গণতান্ত্রিক ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনে অবদান রেখেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতন আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।
নোটিশে বলা হয়, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া অবশ্যই মেধার ভিত্তিতে হতে হবে এবং অন্য কোনও মানদণ্ডে ভর্তি প্রক্রিয়া সাধারণত বৈষম্যমূলক, স্বেচ্ছাচারী এবং অযৌক্তিক, কোনও বৈধ রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্যের সঙ্গে এর কোনও যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।
প্রাতিষ্ঠানিক সফরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। কোটার বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সাইমা হক বিদিশা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা এ নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছি। তাদের কাজ চলমান রয়েছে। কমিটি সুপারিশ দেবে, সেই আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরীক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষা দেবে বা ভর্তি পরীক্ষা দেবে তখন আপনাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত তাদের জানিয়ে দেবো।
কমিটিকে কোনও সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে কিনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেওয়া হয়নি। তবে দ্রুত সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছরের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারও ২০২৪-২৫ সেশনের ভর্তিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৫ শতাংশ, ওয়ার্ড/পোষ্য কোটায় ১ শতাংশ, উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় ১ শতাংশ, হরিজন ও দলিত সম্প্রদায় কোটায় ১ শতাংশ, প্রতিবন্ধী (দৃষ্টি, বাক, শ্রবণ, শারীরিক, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস/হিজড়া) কোটায় ১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানো বিষয়টি বহাল রয়েছে। তাছাড়া খেলোয়াড় কোটায় ৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে গত বছর থেকে।









