দায়িত্বশীলদের গাফিলতি ও অবহেলার ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন পার্কগুলোর এখন বেহাল অবস্থা। নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না রাখায় ময়লা আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে পার্কগুলো। ভেঙে গেছে সীমানা প্রাচীর, সিঁড়িসহ পার্কের মূল্যবান জিনিসপত্র। অধিকাংশ পার্কের নেই নামফলকও।
জানা গেছে, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা এবং স্থানীয়রা অধিকাংশ পার্কের নামফলক ভেঙে ফেলেছে। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, পার্কের নামফলকের সঙ্গে পতিত সরকারের সাবেক মেয়রদের নাম, বিশেষ করে তাপস এবং সাঈদ খোকনের নাম যুক্ত ছিল।
সরেজমিন দেখা যায়, ডিএসসিসির আওতাধীন মালিটোলা পার্ক, বংশাল ত্রিকোণাকৃতি পার্ক, নবাব সিরাজউদৌল্লা পার্ক, নাজিরাবাজার পার্ক, গুলিস্তান পার্ক (শহীদ মতিউর পার্ক), বকশী বাজার পার্কসহ অন্তত ১০টি পার্ক ঘুরে দেখা যায়, কোনও পার্কের নামফলক অক্ষত নেই।
নামফলক ভাঙার বিষয়ে বাবুবাজারের বাসিন্দা হিল্লোল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পটপরিবর্তনের পর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা, বিশেষ করে বিএনপির নেতাকর্মীরা আ.লীগ সরকারের যেসব উন্নয়নমূলক কাজ ছিল বা অবকাঠামো তৈরি করেছে সব কিছুতেই হামলা চালিয়েছে। মূলত পার্কের নামফলকে মেয়র তাপসের নাম থাকায় তারা ভেঙে ফেলেছে। ’
নয়াবাজারের বাসিন্দা রিক্তা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু নামফলক না, ৫ আগস্টের পর অনেক কিছুই ভাঙচুর করা হয়েছে। রাত হলেই পার্ক এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। কোনও লাইট নেই। শুরুতে যা ছিল সব ভেঙে গেছে বা কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। আগে নিয়মিত পার্কে আসা হতো। কিন্তু এখন আর সেই পরিবেশ নেই, নষ্ট হয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের কাছে অনুরোধ, স্থানীয় বাসিন্দারা যেন সকাল বিকাল পার্কে অন্তত চলাফেরা করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করুন।’
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা তাহের মিয়াজী বলেন, ‘অনেক আগ থেকেই বাহাদুর শাহ পার্কের সীমানা নির্মাণের কাজ চলছিল। ৫ আগস্টের পর অনেকে সেখান থেকে ইট, বালু এমনকি রড পর্যন্ত নিয়ে গেছে। যে যেভাবে পেরেছে সেভাবে নতুন করে প্রভাব খাটানো শুরু করেছে। পার্কের চারপাশ নতুন করে দখল করে ব্যবসা শুরু করেছে, কেউ কিছু বলার নেই। তাছাড়া ঐতিহ্যবাহী এই পার্কের সৌন্দর্য ভবঘুরেদের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে।’
বেশিরভাগ পার্কের পাবলিক টয়লেট তালাবদ্ধ
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন যে ৩০টি পার্ক আছে সবগুলোতে নাগরিক সেবার জন্য পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও সেসব পার্কের টয়লেট এখনও তালাবদ্ধ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পার্কের টয়লেটগুলো অনেকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। কেউ পারিবারিক বা সংগঠনের টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করছে, কেউ স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করছে, আবার কেউ অকারণে তালাবদ্ধ করে রেখেছে। যার ফলে পার্কে ঘুরতে বা আড্ডা দিতে আসা দর্শনার্থীদের টয়লেট না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, ধূপখোলা মাঠের পাশে অবস্থিত মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মাঠের পাবলিক টয়লেটটি তালাবদ্ধ। মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি এই টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী খালেক সরদার পার্কের পাবলিক টয়লেটটিও তালাবদ্ধ। সেটি শুধু সেখানকার পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যরা ব্যবহার করেন। এছাড়া নবাব সিরাজউদ্দৌলা পার্কের টয়লেট ব্যবহার করা হচ্ছে রেস্টুরেন্টের স্টোর রুম হিসেবে।
পার্কের পাবলিক টয়লেটের বিষয়ে ধূপখোলার বাসিন্দা লামিয়া ইসলাম জানান, ‘পুরুষরা যেখানে সেখানে প্রস্রাব করতে পারে, কিন্তু আমাদের তো সেই সুযোগ নাই। পার্কে ব্যায়াম করতে আসা নারীরা যখন দেখে পাবলিক টয়লেটে তালা ঝুলিয়ে রাখা তখন অস্বস্তিবোধ করেন। নিরুপায় হয়ে আবার জরুরি কাজ সারতে বাসায় যাওয়া লাগে। পার্কের টয়লেটটা উন্মুক্ত হলে সবার সুবিধা হয়।’
পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জিন্দাবাহার পার্কের টয়লেট আগে ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এখন বিএনপির দখলে। আগে কফি শপের দোকানদার টয়লেটকে স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করতো। এখন রেস্টুরেন্টের লোকজন তাই করে। মাঝখানে আমরা যারা পার্কে একটু স্বস্তি খুঁজতে আসি তারা বিপাকে পড়ি।’
নামফলক ও দখল হয়ে যাওয়া টয়লেটের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টয়লেট আসলে ব্যক্তি বা কোনও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে নির্মাণ করা হয়নি। এটাকে স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করারও সুযোগ নেই। তাছাড়া কেউ যদি পার্কের কোনও কিছু ইজারা নিয়ে থাকেন তার কোনোরূপ পরিবর্তনেরও এখতিয়ার কারও নেই। যেসব পার্কের নামফলক নেই, সেগুলো নতুনভাবে করার ব্যবস্থা করা হবে।’









