‘শেখ হাসিনাকে ফেরত পেতে হলে আগে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে’

দিল্লি প্রতিনিধি
০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ২২:০০আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ২২:৫২

‘বাংলাদেশ সরকার যদি সত্যিই চায় শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক, তাহলে তাদের আগে এটা প্রমাণ করতে হবে যে তার বিচারের পদ্ধতিটা প্রতিহিংসামূলক নয়, বরং পুনরুদ্ধারমূলক (‘রেস্টোরেটিভ’) হবে। এটা নিশ্চিত করা গেলে তবেই শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের ওপর সঠিক চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব।’

ভারতে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই মুহূর্তে সে রকমটাই মনে করছেন এবং তাদের এই ধারণার একটা পরিপ্রেক্ষিতও আছে। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এই ভাবনার কথা ও এর পেছনের যুক্তিগুলো শেয়ার করেছেন তারা।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কৌঁসুলি ও প্রখ্যাত ব্রিটিশ আইনজীবী করিম আসাদ আহমদ খান সদ্য বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। গত ২৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া চারদিনের ওই সফরে তিনি মূলত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়নে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে কিনা, তার তদন্তেই ব্যস্ত ছিলেন।

তবে এই সফরে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গেও বুধবার (২৭ নভেম্বর) তার বৈঠক হয়েছে।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে গত ১৭ নভেম্বর ড. ইউনূস যখন টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন, সেদিন তিনি জানিয়েছিলেন বাংলাদেশে জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ যারা ঘটিয়েছে—সেই অভিযুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার জন্য তিনি করিম এ এ খানের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছেন।

করিম এ এ খান ফলে এটা প্রত্যাশিত ছিলই যে ঢাকাতেও বিষয়টি নিয়ে দুজনের মধ্যে আলোচনা হবে এবং হয়েছেও তাই। সেদিনের বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জানানো হয়েছে, জুলাই-আগস্ট গণহত্যা এবং শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনে অসংখ্য গুমের ঘটনায় আইসিসিতে যাতে মানবতাবিরোধী অপরাধে তার বিচার করা যায়, বাংলাদেশ সরকার সেটা নিশ্চিত করতে চাইবে।

আরও জানানো হয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে আইসিসি সব ধরনের সাহায্য করতে প্রস্তুত বলেও প্রসিকিউটর করিম এ এ খান আশ্বাস দিয়েছেন।   

তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রধান উপদেষ্টা কেন আইসিসিতে এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি পৃথক বা সমান্তরাল তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন? বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কি উপলব্ধি করছে যে আইসিটিবিডিতে এই বিচারের কোনও সীমাবদ্ধতা আছে এবং সেই ট্রাইব্যুনালে বিচার হলে তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে?

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা এই মুহূর্তে যে দেশের আতিথেয়তায় আছেন এবং বিচারের জন্য বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি যাদের ওপর নির্ভর করছে– সেই ভারত কিন্তু মনে করছে, আইসিটিবিডিতে বিচার হলে শেখ হাসিনা বা অন্য অভিযুক্তরা সঠিক বিচার পাবেন না, এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

আর ভারত যদি মনে করে—সেই বিচার সুষ্ঠু হয়নি, তাহলে যে তাকে ফেরত দেওয়ারও প্রশ্ন উঠবে না, এ কথা বলাই বাহুল্য।

কেন আইসিটিবিডিতে বিচার হলে সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, এটা জানতে দিল্লিতে বাংলা ট্রিবিউন কথা বলেছে আন্তর্জাতিক আইনের একাধিক বিশেষজ্ঞর সঙ্গে। এদের মধ্যে ভারতের দুজন সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলও আছেন, যারা নরেন্দ্র মোদি সরকারের শীর্ষস্থানীয় আইন কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

এ বিষয়ে তাদের যুক্তিগুলো ঠিক কী, এই প্রতিবেদনে সেটাই সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিটিবিডিতে বিচারের মূল ভিত্তি হলো ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন– যার প্রধান লক্ষ্য ছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার। সেই সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ সংজ্ঞায়িত আইনের উদাহরণ ছিল মাত্র দুটি– ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল ও টোকিও ট্রাইব্যুনালের সনদ। ১৯৭৩ সালের আইনের খসড়া প্রণেতারা এই দুটি সংজ্ঞা গ্রহণ করেই মানবতাবিরোধী অপরাধের তালিকায় নির্যাতন, অপহরণ এরকম কয়েকটি অপরাধ যুক্ত করেছিলেন।

কিন্তু বিগত ৫০ বছরে মানবতাবিরোধী অপরাধের তালিকা অনেক বেশি সম্প্রসারিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সমর্থিত দুটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল– রুয়ান্ডা ও যুগোস্লাভিয়ায় গণহত্যার বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল যেসব রায় দিয়েছে, তারপর মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন সেগুলোকে বিবেচনায় না নিয়ে আইসিটিবিডি যদি ১৯৭৩ সালের আইনের ভিত্তিতেই তদন্ত ও বিচার চালায়, তাহলে তা কিছুতেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃতি পাবে না।

বিক্রমজিৎ ব্যানার্জি ভারতের আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইসিটিবিডি যে রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত নয়– সেটা তারা এখনও প্রমাণ করতে পারেনি।

ভারতে সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবীর কথায়—‘এখন যিনি ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি (তাজুল ইসলাম), আগে একাত্তরের অপরাধগুলোর যখন বিচার চলছিল তখন তিনি জামায়াতের অভিযুক্ত নেতাদের পক্ষের আইনজীবী ছিলেন। সে রকম বেশ কিছু মামলা এখনও ঝুলে আছে, যদ্দুর জানি।  সেদিক থেকে নতুন করে সরকারি প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে তার ‘নিরপেক্ষ’ থাকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা অমূলক হবে না।

ভারতের এই আইনজীবীর অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালে বিচার দ্রুত করার জন্য তদন্তকারীরা বা প্রসিকিউশন ‘সহজ পন্থা’ অবলম্বন করছেন। তাতেও বিচার প্রক্রিয়ার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি সাবেক পুলিশ প্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের ৪৩ দিনের রিমান্ড প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তার ভাষ্যমতে, এত দীর্ঘ সময় রিমান্ডের কারণে আসামিকে দিয়ে  ‘যা খুশি বলিয়ে নেওয়া’ খুব সহজ।

ভারতে বাংলা ট্রিবিউন যে পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছে, তারা প্রত্যেকেই একমত যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ‘বলিষ্ঠ দাবি’ পেশ করতে হলে বাংলাদেশকে আগে প্রমাণ করতে হবে সে দেশে অভিযুক্তদের ‘পক্ষপাতহীন, সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার’ সম্পন্ন হবে। এটাই তার প্রত্যর্পণের প্রথম ও প্রধান শর্ত।

ভারতে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও একাধিক রাজ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা বিক্রমজিৎ ব্যানার্জির কথায়, ‘শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ এলে তার একটা কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক মাত্রা যেমন আছে, তেমনই একটা আইনগত মাত্রাও আছে।’

‘ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার আগে দেখতে চাইবেন—বাংলাদেশে অভিযুক্তদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে কিনা। সেটা যদি না-হয়, তাহলে সেই অনুরোধে সাড়া দেওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠবে না’, বলছিলেন তিনি।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও যেভাবে বিরোধীদলীয় নেতা হলেন ঋতব্রত
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম