বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য ছাড়ের অফার দেওয়া হয়। একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বুকিং দিয়ে পণ্যটি দ্রুত গ্রাহকের কাছে সরবরাহের কথা বলা হয়। আরও চটকদার কথা লিখে করা হয় মার্কেটিং। একপর্যায়ে সেই বুকিংয়ের টাকা মেরে উধাও। আর এভাবে অনলাইন তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসার নামে সাধারণ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণির প্রতারক চক্র।
সম্প্রতি যাত্রীদের মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম। এই ধরনের প্রতারকদের কবলে দেশের লাখ লাখ মানুষ। গত ১০ বছরে এসব প্রতারকরা সাধারণ মানুষের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ কেউ নামমাত্র ক্ষতিপূরণ পেলেও বিশাল অংশের গ্রাহক কোনও ধরনের ক্ষতিপূরণ পাননি। কিংবা প্রতারকরা আইনের আশ্রয়ে আসেনি। উল্টো কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে আরাম আয়েশে জীবনযাপন করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ই-কমার্স কিংবা অনলাইনভিক্তিক এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি আইনের মধ্যে এনে নজরদারি করা প্রয়োজন। নতুবা দিন দিন এই ধরনের প্রতারণা বাড়তেই থাকবে।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. কুদরাত-ই খুদা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনও ব্যবসা সরকারি নিয়েমের মধ্যে করা উচিত। আর অনলাইনে যেহেতু ঝুঁকি রয়েছে সেহেতু এটির ওপর অবশ্যই নজরদারি করা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে যেন কারও কোনও দায়বদ্ধতা নেই। যখন সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন সবার হুঁশ ফেরে। এর আগে কেউ কিছু ভাবেও না।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোভ সংবরণ করতে হবে। কোনও কিছু দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে না। এই যে মুনাফা দ্বিগুণ করার বিজ্ঞাপন মাঝে মধ্যে চোখে পড়ে, আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কম ছাড়ের যে অফার দেয়, তাতে সাধারণ মানুষ আকৃষ্ট হয়ে যায়। দেখে-শুনে বুঝে তারপর এগোতে হবে। সবার মধ্যে এই সচেতনতা আনা প্রয়োজন।’
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির প্রতারণায় ফতুর হয়েছেন দেশের লাখ লাখ আমানতকারী। দ্বিগুণ মুনাফার লোভ দেখিয়ে কোম্পানিগুলো টাকা নিয়ে হয় পালিয়েছে, নয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিভিন্ন এমএলএম, অনলাইন ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নানা প্রলোভন দিয়ে সাধারণ মানুষের অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা পকেটে পুরেছে। গ্রাহকরা বিনিয়োগের এসব টাকা ফেরত পাবেন কিনা তা অনিশ্চিত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রতারিত লাখ লাখ মানুষ পথে বসেছে।
অতি মুনাফার ফাঁদে ফেলে গ্রাহকদের টাকা লুটের সবচেয়ে বড় দুই উদাহরণ- ডেসটিনি ও যুবক। অভিযোগ রয়েছে, এ দুই প্রতিষ্ঠান সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে প্রায় ৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে গ্রাহকের বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি বা যুবক। ১৯৯৬ সালে যুবকের নিবন্ধন দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (রেজসকো)।
কথিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি (এমএলএম) ইউনিপেটুইউতে ১০ মাসে দ্বিগুণ লাভের আশায় ৬ লাখ বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ করা ৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
অতিরিক্ত মুনাফার লোভ দেখিয়ে ২০১৩ সালে প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় আইসিএল গ্রুপ। পরবর্তীতে নামসর্বস্ব ১৩টি প্রতিষ্ঠান ফেলে উধাও হয়ে যায় গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও মূল উদ্যোক্তা শফিকুর রহমানসহ পরিচালকরা। যদিও পরে গ্রুপটির মূল উদ্যেক্তা শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী আইসিএল গ্রুপের পরিচালক কাজী সামসুন নাহার মিনা র্যাবের হাতে আটক হন। তবে এখনও প্রতারিত গ্রাহকরা টাকা ফিরে পাননি।
১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ‘এহসান গ্রুপ পিরোজপুর-বাংলাদেশ’ নামের এক কোম্পানির চেয়ারম্যান রাগীব আহসান এবং তার এক সহযোগীকে সম্প্রতি গ্রেফতার করেছে র্যাব। এহসান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, এহসান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেডসহ কয়েকটি মাদ্রাসা খুলে ওই কোম্পানি ব্যবসা চালিয়ে আসছিল।
গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের পর প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কেউ কেউ দেশত্যাগ করছেন, বিদেশে পাচার করছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জসহ আলোচিত ১৪টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তদন্ত করে এমন অভিযোগ পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- সিরাজগঞ্জ শপ, ধামাকা শপিং ডটকম, নিরাপদ ডটকম, আলাদিনের প্রদীপ, আলেশা মার্ট, কিউ-ডটকম, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, দালাল, এসকে ট্রেডার্স ও মোটরস। এর মধ্যে ধামাকা শপিং গ্রাহকের ৫৯৮ কোটি টাকা নিয়ে উধাও।
ই-অরেঞ্জ নামের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ গ্রাহকদের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকদের কয়েকজন গ্রেফতারের পর এখন কারাগারে। আরেক মালিক পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল রানা পলাতক। এছাড়াও অল্প সময়ের মধ্যে গ্রাহকের ২৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস নামের একটি এমএলএম কোম্পানির কয়েকজন গ্রেফতার হন।
সর্বশেষ এই প্রতারণার তালিকায় যুক্ত হলো ফ্লাইট এক্সপার্ট। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম।
এসব প্রতিষ্ঠানই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে নানা ধরনের ই-কমার্স ও এমএলএম কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের লাভের লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে।
রাজধানীর মালিবাগ, মগবাজার, গুলশান, ফার্মগেট, হাতিরপুল, মতিঝিল, পল্টনে বেশি সক্রিয় এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক প্রতিষ্ঠানেরই একাধিক অফিস রয়েছে।
সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিগত ১০ বছরে এই খাতে প্রতারণা করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আমাদের টিম এ ধরনের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি করছে।’
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) জেনারেল ম্যানেজার ইকরামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলে সাধারণত এর প্রভাব তো পড়েই। ফ্লাইট এক্সপার্ট আমাদের সদস্য। আমরা বুঝতেও পারিনি, তবে নজরদারি করছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘উন্নত দেশে ই-কমার্স খাতে নজরদারি ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা পর্যবেক্ষণের জন্য ফেয়ার ট্রেড কমিশন থাকে। আমাদের দেশে এ ধরনের কোনও কমিশন নেই। আমাদের প্রতিযোগিতা কমিশন রয়েছে। কিন্তু এটির ক্ষেত্র সীমিত।’









