বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন ও মামলা বাতিল আবেদনের শুনানিতে আওয়ামীপন্থি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (১১ আগস্ট) দুপুরে বিচারপতি শেখ জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের এজলাস কক্ষে এ হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।
এসময় আদালত এ আবেদনের পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী রবিবার (১৭ আগস্ট) দিন ধার্য করেন।
প্রসঙ্গত, গত ২৪ জুলাই সকালে ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওইদিন রাতে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২৯ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে বেআইনি রায় দেওয়া ও জাল রায় তৈরির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় করা মামলায় তাকে ভার্চুয়ালি গ্রেফতার দেখানো হয়। বিচারক হিসেবে দুর্নীতি ও বিদ্বেষমূলকভাবে বেআইনি রায় দেওয়াসহ জাল রায় তৈরির অভিযোগে শাহবাগ থানার মামলায় বুধবার (৬ আগস্ট) তার সাতদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় আবদুল কাইয়ুম আহাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। এ ঘটনায় তার বাবা আলাউদ্দিন গত ৬ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৪৬৭ জনকে আসামি করা হয়।
পরে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হকের জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছিল।
আদালতে এবিএম খায়রুল হকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী এমকে রহমান, মহসীন রশিদ, কামরুল হক সিদ্দিকী, মনসরুল হক চৌধুরী, জেডআই খান পান্না, সৈয়দ মামুন মাহবুব ও মোতাহার হোসেন সাজু। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাসেল আহমেদ, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইবরাহিম খলিল প্রমুখ।
এদিন দুপুর ৩টায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টকে বলেন, এই আবেদন শুনানির জন্য আমাদের এক সপ্তাহ সময় নিতে বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তাই এক সপ্তাহ পর এটা শুনানির জন্য আসুক। আমরা এক সপ্তাহ সময় চাচ্ছি।
আইনজীবী মহসীন রশিদ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি আদালতকে এভাবে নির্দেশনা দিতে পারেন না। এবিএম খায়রুল হক সাবেক প্রধান বিচারপতি। তিনি ১০–১২ বছর আগে অবসরে গেছেন। তাকে এক বছর আগে দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় চলতি বছরের ২৪ জুলাই গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা দেখেছি তাকে তার পেছনে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে তোলা হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগ তার বিষয়ে নীরব। তাকে হাতকড়া পরানো মানে পুরো বিচার বিভাগকে হাতকড়া পরানো। আমরা বিচার বিভাগের জন্য এখানে এসেছি। বিশ্বের কোথাও এরকম নজির নেই। হাইকোর্ট এই বিষয়ে রুল জারি করার পরে অ্যাটর্নি জেনারেল যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবেন।’
তবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাসেল আবারও হাইকোর্টকে এই সপ্তাহে বিষয়টি শুনানি না করার জন্য অনুরোধ করেন। আইনজীবী মহসীন রশিদ বলেন, ‘বিচারপতি খায়রুল হককে আদালত প্রাঙ্গণে অপমান করা হয়েছে। বিচারকদের অপমান করা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবী আদালতকে বলেন, ‘খায়রুল হক বিচার বিভাগের জন্য বাধা সৃষ্টি করছেন। তিনি বিচার বিভাগ ধ্বংস এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে হত্যার জন্য দায়ী।’ এ সময় খায়রুল হকের সমর্থক কয়েকজন আইনজীবী চিৎকার করে সরকার-সমর্থিত আইনজীবীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা খায়রুল হকের আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে যখন দেশ ছাড়া করা হলো তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? খায়রুল হকের মতো গণতন্ত্র ধ্বংসকারী, কুলাঙ্গারের জামিন চাইতে এসেছেন।’
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার বিরুদ্ধে বিগত সময়ে আটটি মামলা হয়েছে। তখন আপনারা কোথায় ছিলেন?’
এক পর্যায়ে আইনজীবীদের কয়েকজন আদালত কক্ষে চিৎকার, বিশৃঙ্খলা এবং হাতাহাতি শুরু করেন। যদিও আদালত বারবার তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এরপর আদালত আইনজীবীদের নিবৃত্ত করে শুনানি মুলতবি করে আগামী রবিবার (১৭ আগস্ট) ১১টায় সময় নির্ধারণ করে দেন। পরে খায়রুল হকের আইনজীবীরা এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন।









