সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্স নারী শিক্ষার্থী সাহারা চৌধুরীর আজীবন বহিষ্কারাদেশের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ১৬২ জন শিক্ষক, গবেষক, লেখক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নাগরিক।
শনিবার (১৬ আগস্ট) গণমাধ্যমকে পাঠানো বিবৃতিতে তারা অবিলম্বে বহিষ্কারাদেশ বাতিল ও সাহারার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শ্রেণীকক্ষে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়াও ৪টি দাবি উত্থাপন করেছেন তারা।
এতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে, গত ১১ আগস্ট রাতে ফেসবুকে অ্যান্টার্কটিকা চৌধুরী নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আসিফ মাহতাব উৎসকে বিষয়বস্তু করে দুইটি কার্টুন ক্যারিকেচার প্রকাশ করা হয়। ক্যারিকেচারগুলো প্রকাশের পর ড. সরোয়ার ও উৎস অ্যাকাউন্টটিকে সাহারা চৌধুরীর বলে দাবি করেন এবং তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে এই মর্মে সাহারা চৌধুরীর বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেন। এরপর সাহারা চৌধুরীও নিরাপত্তাহীনতা এবং হুমকির মুখে ড. সরোয়ার ও উৎসসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়।
বিবৃতিতে নাগরিকরা বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে লক্ষ্য করছি, বিগত কয়েক বছর ধরে ড. সরোয়ার এবং উৎসের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী লাগাতার ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে ঘৃণা ছড়িয়ে তাদের হত্যাযোগ্য করে তুলছেন। এই সংঘবদ্ধ বিমানবিকীকরনের ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রে মজলুম এই মানুষগুলো আরও লাঞ্ছনা এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শিক্ষক পরিচয়কে ব্যবহার করে সমাজে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিভেদ ছড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশাকেও তারা কলুষিত করেছেন।
এতে আরও বলা হয়, কোনও নির্দিষ্ট কারণ দর্শানো ছাড়াই সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর চাপে গত ১০ আগস্ট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাহারা চৌধুরীকে আজীবন বহিষ্কার করেছে। আমরা জানতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন নিয়ম অগ্রাহ্য করার কারণে সাহারাকে আজীবন বহিষ্কার করা হলো? যদি কোনও নিয়ম তিনি অগ্রাহ্য করে থাকেন তার শান্তি আজীবন বহিষ্কার কিনা? বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা? প্রতিনিয়ত সহপাঠীদের দ্বারা হুমকির শিকার হওয়া সাহারার মানসিক স্থিতি বিবেচনা করা হয়েছিল কিনা?
নাগরিকেরা বলেন, সাহারার বহিষ্কার সংঘবদ্ধ চক্রের মনোযোগের কারণে প্রচারণা পেলেও গত এক বছরে হিজরা পল্লিতে আগুন, খুন, জখম, জনসম্মুখে হেনস্তা, বস্ত্রহরণসহ ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অসংখ্য সহিংসতার ঘটনা জনপরিসরে আড়ালেই থেকে গেছে। লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের মানুষকে শিক্ষাঙ্গণ থেকে বিতাড়িত করা এই সহিংসতারই সাম্প্রতিক উপসর্গ। সম্প্রতি ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) কর্তৃপক্ষ কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই পাঁচ শিক্ষার্থীকে তথাকথিত ‘সমকামিতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের দাবির মুখে আবাসিক হল থেকে বহিষ্কার করেছে। কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বিরোধী তো বটেই, একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও শামিল। শিক্ষাঙ্গণ যদি কেবল সমাজে বিদ্যমান মতামত ও মূল্যবোধের প্রতিফলক হয় তবে সমাজ পরিবর্তনের চাবিকাঠি হিসেবে শিক্ষার ভূমিকা ভূলুণ্ঠিত হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার নানাবিধ সংস্কৃতি, জাতি ও লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষজনের প্রতি যথাযথ সহমর্মিতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা মনে করি ঘৃণার বিষবাষ্প সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ার আগেই, বাংলাদেশে সব নাগরিকের পরিচয়, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে সম্মান করে সহাবস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের ৪টি দাবির মধ্যে রয়েছে—
১। অবিলম্বে সাহারা চৌধুরীর আজীবন বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে তাকে শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যায়তনে ভিয় পরিচয়ের মানুষদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান সব বৈষম্য দূর করতে হবে।
২। রাষ্ট্রকে সব প্রান্তিক, লিঙ্গীয় সংখ্যালঘু মানুষের জীবনের স্বতন্ত্র পরিচয়ের সাংবিধানিক অধিকার প্রদান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৩। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়) বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি রক্ষায় কার্যকর জেন্ডার সংবেদনশীল আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে ও তা অনুসরণ করতে হবে।
৪। আসিফ মাহতাব উৎস ও ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের লাগাতার অসংবেদনশীল আচরণ এবং সমাজে বিভেদ, ঘৃণা ছড়ানোর জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
বিবৃতিতে সই করা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আজফার হোসেন, আইনজীবী মানজুর আল মতিন, সাংবাদিক সায়দিয়া গুলরুখ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সিউতি সবুর, গবেষক নাসরিন খন্দকার, আইনজীবী আবেদা গুলরুখ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাভিন মুরশিদ, শিক্ষক মানস চৌধুরী, গবেষক রোকাইয়া শতদ্রু, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মিম আরাফাত মানব, গবেষক ও শিল্পী তারাহুম, বিপণনকর্মী দেবযানী মোদক, উন্নয়ন কর্মী মো. আবু রায়হান, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, শিক্ষার্থী ও অ্যাকটিভিস্ট যারীন ফারিহা, যোগাযোগ কর্মকর্তা আফিয়া জাহিন, শিল্পী ও গবেষক অরূপ রাহী, প্রকাশনা ও থিয়েটারকর্মী নাজিফা তাসনিম খানম তিশা, গণিতবিদ নাফিসা রায়হানা, উন্নয়নকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্ট আমিনা সুলতানা সোনিয়া, উন্নয়নকর্মী ও গবেষক নুসরাত খান, শিক্ষক মিথিলা মাহফুজ, সাংবাদিক তুষা বড়ুয়া, স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মী সাকি ফারজানা, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষক লাবনী আশরাফি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজলী সেহরীন ইসলাম, শিক্ষার্থী ফাহিম আলম, চাকরিজীবী রেক্সোনা পারভীন প্রমুখ।









