দুঃখ-কষ্ট ও হতাশা নিয়েই চলে গেলেন বিভুরঞ্জন

আরমান ভূঁইয়া
২৩ আগস্ট ২০২৫, ২৩:১৪আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৫, ০০:১৪

পঞ্চাশ বছরের সাংবাদিকতার পথচলা শেষ হলো এক অপূর্ণ স্বপ্ন, অবহেলা ও দুঃখকষ্টের বোঝা বুকে নিয়ে। দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক সৎ ও সাহসী নাম—বিভুরঞ্জন সরকার। থেমে গেলো তার সত্য লেখার কলম। সাংবাদিকতার ইতিহাসে রেখে গেলেন এক অন্যান্য স্থাপন। পুরো জাতির কাছে রেখে গেলেন এক খোলা চিঠির বার্তা। 

শনিবার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাসাবো রাজারবাগ বরদেশ্বরী মন্দিরে স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের চোখের জলে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় এই প্রবীণ সাংবাদিকের। শোকমগ্ন উপস্থিত সবাই জানালেন, বিভুরঞ্জন শুধু একজন সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন সৎ, সাহসী ও আপসহীন এক মানবিক মানুষ। রাজনৈতিক মাঠেও তিনি ছিলেন সৎ ও সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক।

গত শুক্রবার (২২ আগস্ট) বিকালে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদী থেকে নৌ পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকেরা জানান, মরদেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই। এর আগে বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) সকালে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, কিন্তু আর ফিরে আসেননি। অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরেছে তার নিথর মরদেহ। 

শনিবার সন্ধ্যায় শেষকৃত্যের মধ্য দিয়ে তার চিরবিদায় ঘটে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শ্মশানে তার মরদেহ আনার পর পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজ্জাদ জহির চন্দন, যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভসহ অনেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার সৎকার শেষ হয়।

অপূরণীয় ক্ষতি, রাজনীতির বাইরে থাকার আহ্বান

বিভুরঞ্জনের ভাই চিররঞ্জন সরকার এক আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, ‘বিভুরঞ্জন পৃথিবী থেকে চলে গেছে। এতে কারও কোনও ক্ষতি হয়নি, কিন্তু আমাদের পরিবারের ক্ষতি অপূরণীয়। আমরা কীভাবে এই শোক সামলাবো, জানি না। আমার ভাই কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাই অনুরোধ করছি, তাকে রাজনৈতিক টানাটানির মধ্যে নেবেন না। আমরা কারও দয়া বা করুণা চাই না। আমরা শুধু চাই, আমার ভাই যেন তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু পায়। আপনারা জানেন, তিনি কতটা সৎ ও সাহসী মানুষ ছিলেন। তিনি সবসময় সত্যের পক্ষে লিখেছেন।’

তিনি বলেন, ‘দাদা শুধু সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন সৃজনশীল একজন মানুষ। গল্প লিখতেন, কবিতা লিখতেন। সত্যকে সংবাদে রূপ দিতেন। মৃত্যুর আগে একটি খোলা চিঠি লিখে গেছেন। সেখানে তিনি তার জীবনের বেদনা, অভিমান ও আবেগ প্রকাশ করেছেন। আমরা চাই, আর কোনও সাংবাদিক যেন তার মতো হতাশার মধ্যে না পড়ে।’

গণমাধ্যম ব্যবস্থার প্রতি অভিমান

চিররঞ্জন সরকার আরও বলেন, ‘দাদার মৃত্যুতে দায়ী কেবল পরিবার নয়, দায়ী আমাদের সমাজ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো। সৎ সাংবাদিকের ন্যূনতম জীবনযাত্রা নির্বাহের পরিবেশ এই দেশে নেই। যদি গণমাধ্যমগুলো সুষ্ঠু ও ন্যায্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতো, হয়তো আজ এই ক্ষতি আমাদের সহ্য করতে হতো না।’

শেষকৃত্যে সহকর্মীরা কান্নাভেজা কণ্ঠে স্মরণ করেন বিভুরঞ্জন সরকারকে। কেউ কেঁদেছেন প্রকাশ্যে আবার কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলেছেন। 

বিভুরঞ্জনের সহকর্মী ও সাংবাদিকরা বলেন, ‘তিনি ৭০-এর দশক থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত নানা ঘটনা তুলে ধরেছেন। সাহসী সাংবাদিকতা কীভাবে করতে হয়, তা শিখিয়েছেন। তার ভূমিকা আমাদের কাছে চির অমর হয়ে থাকবে।’

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবদুর রহিম হারমাছি বলেন, ‘শেষ জীবনে বিভু দা লেখালেখি করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, অনেক প্রতিষ্ঠানই তার লেখার সম্মানী দিতো না। ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, তারও যথাযোগ্য মূল্য পাননি। সাংবাদিকরা কীভাবে বেঁচে থাকেন, সেটা নিয়ে আমাদের সংগঠন ও নীতি-নির্ধারকদের ভাবতে হবে। নইলে ভালো সাংবাদিকতা বাঁচবে না।’

বিভুরঞ্জনের বন্ধু মানবাধিকারকর্মী রঞ্জন কর্মকার বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই বিভুদা আপসহীন ছিলেন। সামরিক শাসনের সময় তারিখ ইব্রাহিম নামে সাহসী লেখা লিখেছেন। কখনও আপস করেননি। সাংবাদিকতা নিয়ে তার অভিমান, যন্ত্রণা আমরা বুঝতে পারিনি।’

স্বজনদের কান্না, প্রিয়জনদের শোক

শনিবার বিকালে বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় পৌঁছালে স্ত্রী শেফালী সরকারসহ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভিড় জমে যায় সহকর্মী, প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবদের।

বোন ভারতী সরকার বলেন, ‘আমার ভাই কীভাবে মারা গেলো, এখনও কিছুই জানি না। তবে ভাইয়ের এমন মৃত্য মেনে নেওয়া খুবই কঠিন।’

বিভুরঞ্জনের বন্ধু ব্যাংকার আসাদুজ্জামান মুকুল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বিভুরঞ্জন সরকারের লেখা পড়েই আমরা বড় হয়েছি। তার মতো মেধাবী সাংবাদিকের খোলা চিঠি আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে। সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশার এমন দুরবস্থা কেন—এটা সবার ভাবা উচিত।’

খেলাঘরের প্রেসিডিয়াম অধ্যক্ষ শরীফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা উনার লেখার ভক্ত ছিলাম। তার মতো খ্যাতিমান সাংবাদিকের এমন বিদায় মেনে নেওয়া কঠিন।’

কী বার্তা রেখে গেলেন বিভুরঞ্জন!

বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, কাঁদছে পুরো সাংবাদিক সমাজ। তার শেষ চিঠি হয়ে উঠেছে এক সতর্কবার্তা—সাংবাদিকদের দুঃখকষ্ট, অবহেলা ও অনিশ্চয়তা যেন আর কারও ভাগ্যে না জোটে।

বিভুরঞ্জনের শেষ লেখা: খোলা চিঠি থেকে

বিভুরঞ্জন সরকার ২১ আগস্ট সকালে একটি অনলাইন পত্রিকায় নিজের জীবনের ঘটনা ও সাংবাদিকতা নিয়ে একটি খোলা চিঠি লিখে গেছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, তিনি পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশের সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিলেন। এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি সবসময় সত্যের পক্ষে লিখেছেন, মানুষের পক্ষে লিখেছেন, কিন্তু দেখেছেন—সত্য লিখে বাঁচা কখনোই সহজ নয়।

ছাত্রজীবন থেকে সাংবাদিকতায় প্রবেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে অটল থাকা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি—এই চাপের মধ্যেও তিনি সততার সঙ্গে পেশা পালন করেছেন। নিজের লেখা ও অবদানের জন্য তিনি কখনও যথাযথ সম্মান বা আর্থিক নিরাপত্তা পাননি। পেশার শেষ দিনগুলোতে তার বয়স ও অসুস্থতার সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের চাপও যুক্ত হয়ে তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করেছে।

চিঠিতে তিনি তার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন এবং শেষ মুহূর্তে সবার জন্য শান্তি কামনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।’

৭১ বছর বয়সী বিভুরঞ্জন সরকার সর্বশেষ দৈনিক আজকের পত্রিকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। 

বিভুরঞ্জন সরকার ছাত্র জীবনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন। স্কুলে পড়াকালীন তিনি সাংবাদিকতার পেশায় জড়ান। দৈনিক আজাদের মফস্বল সাংবাদিক দিয়ে তার সাংবাদিক ক্যারিয়ার শুরু করেন। তিনি চাকরি করেছেন দৈনিক যায়যায়দিন, দৈনিক সংবাদে, সাপ্তাহিক একতায়, দৈনিক রূপালীতে। নিজে সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক ‘চলতিপত্র’। নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন ‘মৃদুভাষণ’ নামের সাপ্তাহিকে। ‘দৈনিক মাতৃভূমি’ নামের একটি দৈনিকের সম্পাদনারও করেছেন তিনি। দেশের প্রায় সব দৈনিক পত্রিকা এবং অনলাইনে তার অসংখ্য লেখা ছাপা হয়েছে। দৈনিক ‘জনকণ্ঠ’ যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখন প্রথম পৃষ্ঠায় তার লেখা মন্তব্য প্রতিবেদন ছাপা হতো। তার লেখার জন্য বিভিন্ন বিশিষ্টজনের কাছ থেকে অনেক প্রশংসাও পেয়েছিলেন। তবে পাননি সামাজিক বা আর্থিক মর্যাদা। শেষ জীবনের আর্থিক অনটনের জীবন বিসর্জন দিয়েন বিভুরঞ্জন। 

বিভুরঞ্জন সরকারের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে বোদা উপজেলা শহরের নগরকুমারী (উত্তরপাড়া)। বাবা মৃত অনিল চন্দ্র সরকার। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে বিভুরঞ্জন ছিলেন সবার বড়। বিভুরঞ্জনের এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। মেয়ে বড়, তিনি এমবিবিএস শেষ করে একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসাবে আছেন। ছেলে ঋত সরকার বুয়েটে থেকে ইঞ্জিনিয়ার শেষ করে বর্তমানে বেকার আছে। তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন।

/এমকেএইচ/
সম্পর্কিত
আত্মপ্রকাশ করলো ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল
লালন আখড়ায় হামলা চালিয়ে সাংবাদিককে কুপিয়ে জখম, বিএনপি নেতা আটক
জনতুষ্টি নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার: তথ্যমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম