শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ শিকার মামুন!

আরমান ভূঁইয়া
১০ নভেম্বর ২০২৫, ২১:০৩আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ২১:২৪

আদালতে হাজিরা শেষে ফেরার পথে রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হয়েছেন তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাইফ মামুন। 

সোমবার (১০ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফটকের সামনে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। 

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখে মাস্ক পরা দুই ব্যক্তি পিস্তল বের করে মামুনকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত মোটরসাইকেলযোগে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।

আহত অবস্থায় মামুনকে দ্রুত ন্যাশনাল মেডিক্যালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

এই হত্যাকাণ্ডের পর আবারও আলোচনায় এসেছে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আলোচনায় এসেছে ‘ইমন-মামুন বাহিনী’ বনাম ‘জোসেফ গ্রুপের’ সংঘর্ষ ও টার্গেট কিলিং।

মামুন হত্যাকাণ্ড ও পুরোনো শত্রুতা

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানা গেছে, সোমবার সকালে একটি মামলায় মামুন হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ। ১৯৯৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার হাউজিং এলাকায় জাহিদ আমিন ওরফে হিমেল হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন তিনি। এ মামলায় তার সঙ্গে আরও পাঁচ জন আসামি রয়েছেন—ওসমান, মাসুদ ওরফে নাজমুল হোসেন, রতন, ইমন ও হেলাল। আদালতে এদিন সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য থাকলেও কোনও সাক্ষী হাজির না হওয়ায় শুনানি পিছিয়ে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

আদালত থেকে বেরিয়ে মামুন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে হাসপাতালের ফটক পার হওয়ার পর হঠাৎ দৌড়ে আবার ভেতরে ফিরে আসেন তিনি। তখনই গুলির শব্দে আশপাশের মানুষ ছুটোছুটি শুরু করেন।

হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী মো. তারেক বলেন, “দুই জন দুর্বৃত্ত হঠাৎ এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। একটি গুলি জানালার কাচে লাগে, কয়েকটি গুলি লাগে মামুনের শরীরে। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আমাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয় তাকে।”

মামুনের শরীরে পাঁচটি গুলির চিহ্ন

নিহত তারিক সাইফ মামুনের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইদুল হোসেন মিলন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, মৃতদেহে মোট পাঁচটি গুলিবিদ্ধ জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মাথার নিচে একটি, বাম পিঠে একটি, বুকের ডান পাশে একটি, বাম হাতের কব্জিতে একটি এবং ডান হাতের কব্জির ওপরে একটি গুলি লেগেছে তার।

জোসেফের টার্গেট মামুন

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই হত্যাকাণ্ড আকস্মিক নয়, বরং দীর্ঘদিনের আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিশোধ-রাজনীতির ধারাবাহিকতা। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যাকাণ্ড ও ঢাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তোফায়েল আহমেদ জোসেফের সঙ্গে সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও তারিক সাইফ মামুনের বিরোধ শুরু হয় বহু বছর আগে।

ইমন ও মামুন একসময় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ইমন-মামুন বাহিনী’ ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তারা দুজনেই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই টিপু হত্যা মামলার আসামি। কারাগারে দীর্ঘদিন একই সেলে ছিলেন মামুন ও ইমন।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তেজগাঁও এলাকায় মামুনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় একদল সন্ত্রাসী। সে সময় মোটরসাইকেল আরোহী ভুবন চন্দ্র শীলের মাথায় গুলি লাগে, পরে তিনি মারা যান। ঘটনার পর পুলিশ জানিয়েছিল, সেই হামলার পেছনে কারাবন্দি ইমনের অনুসারীরা ছিল। সূত্র বলছে, বর্তমাানে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অবস্থান করছে ইমন।

তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি সূত্রের দাবি, মামুন হত্যার মূলে রয়েছে আজিজ আহমেদের ভাই জোসেফ। সূত্রের দাবি, সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার পর থেকেই জোসেফের টার্গেটে ছিলেন মামুন।

‘ইব্রাহিম গ্রুপ’ ছিল মাঠে

সূত্র বলছে, মামুন কিলিং মিশনে মূল ভূমিকা রেখেছে ‘ইব্রাহিম গ্রুপ’। নেতৃত্বে ছিল ইব্রাহিম, সানি, অনিক, পারভেজ, মাসুদ, নাজমুল, ভাইগ্না রনি ও কিলার কামাল। ইব্রাহিম বাহিনীর সদস্যরা ৫ আগস্টের পর থেকে ইমন গ্রুপের হয়ে কলাবাগান, ধানমন্ডি, রায়েরবাজার, জিগাতলা, মনেশ্বর রোড ও ট্যানারি পট্টি এলাকায় শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে আসছে। ফ্ল্যাট, জমি, আড়ত থেকে শুরু করে বাজার-দোকান—সব জায়গায় তাদের আধিপত্য। তাদের ভয়ে ভুক্তভোগীরা মামলা করার সাহস পান না।

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে গুলি করা হয় মামুনকে

বিদেশে বসে জোসেফের কলকাঠি

সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ আহমেদের ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফ। নব্বইয়ের দশকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিচিত পায় সে। ১৯৯৭ সালে তাদের আরেক ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু খুন হন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর গুলিতে।

২০০৪ সালে ফ্রিডম পার্টির নেতা মোস্তফা হত্যা মামলায় জোসেফকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখলেও ২০১৫ সালে আপিল বিভাগ তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন। জোসেফের বিরুদ্ধে একসময় চাঁদাবাজি, খুন ও অবৈধ অস্ত্র বহনসহ অন্তত ১১টি মামলা ছিল। ২০১৮ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে দেশ ছাড়ে জোসেফ। বর্তমানে জোসেফের অবস্থান মালয়েশিয়ায় বলে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে জানা গেছে।

পুলিশ বলছে ‘তদন্ত চলছে, সব দিক দেখা হচ্ছে’

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে দুই ব্যক্তি সরাসরি মামুনকে গুলি করেছে। তাদের পরিচয় যাচাই চলছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা, কী কারণে, কার নির্দেশে—এসব বিষয় আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।”

তিনি আরও বলেন, “আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, কিংবা ব্যাবসায়িক বিরোধ; সব দিকই আমরা বিবেচনায় নিচ্ছি। কোনও তথ্য চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার আগে কিছু বলা ঠিক হবে না।”

ফিরছে পুরোনো আতঙ্ক?

চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় আটক হয়ে ২০ বছর জেলে থাকার পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পান তারিক সাইফ মামুন। জামিনের তিন মাস পরই তেজগাঁওয়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। সেবার বেঁচে গেলেও এবার তিনি খুন হলেন আদালত থেকে বেরিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে। মামুন হত্যাকাণ্ডের পর আবারও রাজধানী ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

/এম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
কিশোর গ্যাং ধরে তাবলীগে পাঠাবো: পুলিশ সুপার
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম