রায়েরবাজার বধ্যভূমি কেবল দিবসেই গুরুত্ব, অন্য সময় চলে ছিনতাই-গাঁজা সেবন

আতিক হাসান শুভ
১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০০ আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০০

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের আগ মুহূর্তে বাঙালিদের মেধাশূন্য করতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের সঙ্গে নিয়ে দেশের শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, চিকিৎসক, দার্শনিক, আইনবিদ, রাজনীতিকসহ বহু বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে তাদের তুলে এনে নির্মমভাবে নির্যাতনে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর সেই বুদ্ধিজীবীদের হাত-পা বাঁধা ক্ষতবিক্ষত ও বিকৃত লাশ রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়। অনেকের লাশ শনাক্তও করা যায়নি, পাওয়াও যায়নি বহু লাশ। ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বরের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণে করে প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পালিত হয় ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’।

সারা বছর অবহেলা ও উদাসীনতার পর ১৪ ডিসেম্বর এলেই কেবল বাড়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমির কদর। বাকি সময় কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সেটি হয়ে থাকে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আস্তানা। দর্শনার্থীদের অনেককেই ঐতিহাসিক এই বধ্যভূমিতে এসে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন আবার কেউবা অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন।

সরেজমিন মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে দেখা যায়, বধ্যভূমির আশেপাশে ময়লার স্তূপ জমে আছে। অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কাজ চলছে। কোথাও খুলে পড়া ইট পুনরায় স্থাপন করা হচ্ছে, আবার কোথাও বা সিমেন্টের আস্তর করা হচ্ছে। ১৪ ডিসেম্বর ‘বুদ্ধিজীবী দিবস’ পালন করার লক্ষ্যে পুরোদমে চলছে ধোয়া মোছার প্রস্তুতি। এই সময়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

তবে দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেবল বুদ্ধিজীবী দিবস এলেই গুরুত্ব বাড়ে বধ্যভূমির। বাকি সময় অবহেলা আর অযত্নে পড়ে থাকে।

এ বিষয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আহসান হাবিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ রাখতে এখানে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এই জায়গাটা সবসময় এত অপরিষ্কার থাকে, মনে হয় কোনও ভাগাড়।’

রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কাজ চলছে (বাংলা ট্রিবিউন)

স্থানীয় এই বাসিন্দা আরও বলেন, ‘শুধু ১৪ ডিসেম্বর এলেই দেখি কর্তৃপক্ষ ১৫ দিন আগে থেকে এটার ভিতরে প্রবেশ নিষেধ করে দেয়। তারপর কোনও রকমে ধোয়ামোছা করে বছরের বাকিটা সময় এভাবে ফেলে রাখে। সিকিউরিটি পর্যন্ত নিয়মিত থাকে না। ভেতরটা এলাকার পাতি মাস্তানদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থী কাউকে একা পেলেই মোবাইল মানিব্যাগ ছিনতাই করে রেখে দেয়। কর্তৃপক্ষ এসব নিয়ে অবগত থাকলেও এখন পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে কোনও আশানুরূপ ব্যবস্থা নেয়নি।’

রায়েরবাজারের স্থানীয় আরেক বাসিন্দা প্রফেসর মেজবাহ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারা বছর এর দেখাশোনার দায়িত্বে তেমন কাউকে দেখা যায় না। এর আশপাশে এমনকি ভেতরে ময়লা আবর্জনার স্তূপ হয়ে থাকে। এমনকি এর ভিতরে ছিনতাই ও রমরমা মাদক সেবন চলে। প্রশাসনের গাফিলতিতে মাদক ব্যবসায়ীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বধ্যভূমি।’

মেজবাহ উদ্দিন আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের এত বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, অথচ নিয়মিত কোনও পরিচর্যা করা হয় না। এখানে যারা দায়িত্বরত আছেন, তারা শুধু বসে বসে বেতন নেন, রক্ষণাবেক্ষণের তেমন কোনও কাজই করেন না। অনেক দর্শনার্থী এমন অব্যবস্থাপনা দেখে ফিরে যান। কেউ একবার এলে দ্বিতীয়বার আর আসেন না। অথচ এখানকার পুরোটা জুড়েই বাঙালি জাতির আবেগ ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে।’

রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কাজ চলছে (বাংলা ট্রিবিউন)

বধ্যভূমির অভ্যন্তরে ও স্মৃতিসৌধ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুনুর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রায়েরবাজার বধ্যভূমি। এটাকে সঠিকভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা সরকারের দায়িত্ব। বিগত সময়ে বহুবার আমরা এর সঠিক তদারকি ও দেখভালের কথা বললেও তারা দায়িত্বে অবহেলা করেছে। বিভিন্ন সময়ে এখানে চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সরকারের উচিত এর অভ্যন্তরে দর্শনার্থীদের পুরোপুরি সুরক্ষা দেওয়া।’

গাজীপুর থেকে রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ঘুরতে আসা তরিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি আমার ছেলে মেয়েসহ এখানে ঘুরতে এলাম, কিন্তু দায়িত্বরত গার্ডরা সংস্কার কাজ চলছে বলে আমাদের প্রবেশ করতে দেয়নি। তারা বলেছেন ১৪ ডিসেম্বরের পরে এলে ভেতরে প্রবেশ করা যাবে। এখন প্রবেশ নিষিদ্ধ, সাময়িকভাবে বন্ধ আছে।’

রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে চলমান সংস্কার কাজের ঠিকাদার গণপূর্ত অধিদপ্তরের মো. ফারুক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের ভিতরে যেই হাউজ আছে সেটা ২০ বছরের অধিক সময় ধরে পরিষ্কার করা হয় না। আমরা কেবল সেট পূর্ণরূপে পরিষ্কার করেছি। আওয়ামী শাসনামলে যারা এখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন তারা আসলে কেবল বসে বসে বেতন নিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের বাজেট হলেও কোনও ধরনের সংস্কার করা হয়নি।’

রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ (বাংলা ট্রিবিউন)

এই ঠিকাদার আরও বলেন, ‘এখানে নেশাখোর ভবঘুরেদের আস্তানা ছিল, তবে এই কয়েকদিন সেটা নেই। এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে বধ্যভূমির চারপাশে সীমানা প্রাচীর সংস্কারকাজ চলমান আছে। এছাড়াও নতুন করে গেট নির্মাণের কাজ চলছে। বধ্যভূমির অভ্যন্তরীণ যত সংস্কার প্রয়োজন সেসব কাজ চলমান আছে। আমাদের সংস্কারকাজ শেষ হলেই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’

/এমএইচআর/এমওএফ/
সম্পর্কিত
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৬, মামলা ৪৯
রাজধানীতে পাকিস্তানি নাগরিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
বায়ুদূষণে আজ বিশ্বে ৯ম স্থানে ঢাকা, শীর্ষে লাহোর
সর্বশেষ খবর
বছরের একটি মাস হাড়ক্ষয় সচেতনতার জন্য নির্ধারণের প্রস্তাব ডা. জুবাইদার
বছরের একটি মাস হাড়ক্ষয় সচেতনতার জন্য নির্ধারণের প্রস্তাব ডা. জুবাইদার
চল্লিশের কোঠায় সুস্থ থাকতে ১৬টি অভ্যাস
চল্লিশের কোঠায় সুস্থ থাকতে ১৬টি অভ্যাস
প্রধানমন্ত্রীর জনসভাস্থলের পাশে মিললো যুবকের মরদেহ
প্রধানমন্ত্রীর জনসভাস্থলের পাশে মিললো যুবকের মরদেহ
বিএনপি ক্ষমতায় না থাকলে জামায়াত-এনসিপিকে শকুনের মত ঠুকরে ছিঁড়ে খাবে আ.লীগ: রাশেদ খাঁন
বিএনপি ক্ষমতায় না থাকলে জামায়াত-এনসিপিকে শকুনের মত ঠুকরে ছিঁড়ে খাবে আ.লীগ: রাশেদ খাঁন
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত