শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী: শত্রুর বিরুদ্ধে কলমই ছিল তার অস্ত্র

রিনা আকতার তুলি
১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০০ আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০০

আজ ১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঘাতকেরা একে একে ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশের সূর্যসন্তানদের। শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাদের মধ্যে অন্যতম। মৃত্যুর ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও বাবার স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান এই শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানেরা। মায়ের মুখে শোনা বাবার অনেক স্মৃতি তাদের এখনও কাঁদায়।

বাংলা নাট্যজগতে আধুনিকতার পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত ছিলেন মুনীর চৌধুরী। লেখনি ও নাটকের মাধ্যমে পাকিস্তানি শত্রু ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তার ছোট ছেলে আসিফ মুনীর তন্ময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় বাবাকে নিয়ে জানালেন নানা কথা।

তন্ময় জানান, তার মা লিলি চৌধুরী মারা যান ২০২১ সালে। মায়ের মুখেই তিনি শুনেছেন বাবার সাহসের গল্প। তিনি বলেন, “বাবা যখন শহীদ হন, তখন আমার বয়স ৪ বছর। মায়ের স্মৃতিশক্তি প্রখর ছিল। মায়ের মুখে বাবার অনেক গল্প শুনেছি। মায়ের মুখে শুনেছি, ১০ ডিসেম্বর থেকেই মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে ঢাকা। এ পরিস্থিতিতে আশাবাদী হয়ে ওঠেন বাবা। বরাবরই সকালে ঘুম থেকে উঠতেন বাবা, উঠেছিলেন ১৪ ডিসেম্বরেও। যুদ্ধের সময় বাবা নিয়মিত বিবিসি শুনতেন। বাবা আম্মাকে বলতেন- লিলি, আর দেরি নেই। দেশ এবার স্বাধীন হয়ে যাবে। আর ভয় নেই আমাদের। আর্মিরা সব পালাচ্ছে। ”

অপহরণ ও হত্যাযজ্ঞ

তন্ময় জানান, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে, যখন মুনীর চৌধুরী খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, হঠাৎ পাঞ্জাবি পরা ২০–২৫ বছর বয়সী একদল যুবক এসে বাড়িতে ঢোকে। দরজায় আঘাত করে চিৎকার করলো, “এই খোল।”

তিনি বলেন, “প্রথমে ভয়ের কিছু ছিল না—কারণ তারা সবাই বাঙালি। কিন্তু হঠাৎই এক যুবক বন্দুক বের করে বাবার পিঠে ধরলো, আর সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠলো বাবা। তারপর তাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়। এটাই ছিল মায়ের সঙ্গে বাবার শেষ দেখা। প্রতিবছর ডিসেম্বর এলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৭১ সালের সেই বিষাদময় মুহূর্ত।”

পরিবার ও প্রতিরোধ

মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে। পৈতৃক নিবাস নোয়াখালীর চাটখিল থানাধীন গোপাইরবাগ গ্রামে। ইংরেজ আমলের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরীর ১৪ সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেও ১৯৫৫ সালে মুনীর চৌধুরী যোগ দেন বাংলা বিভাগে। ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে- রক্তাক্ত প্রান্তর, কবর, চিঠি, কেউ কিছু বলতে পারে না, মুখরা রমণী বশিকরণ প্রভৃতি।

মুনীর চৌধুরী ১৯৪৯ সালে লিলি চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির তিন ছেলে আহমেদ মুনীর ভাষণ, মিশুক মুনীর এবং আসিফ মুনীর তন্ময়। মুনীর চৌধুরী পরিবার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে থাকতেন। তবে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তারা ছিলেন সেন্ট্রাল রোডে মুনীর চৌধুরীর বাবার বাসায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আল–বদর বাহিনী সেখান থেকেই তাকে ধরে নিয়ে যায়, সম্ভবত ওই দিনই তাকে হত্যা করা হয়।

তন্ময় বলেন, “২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাতও শুনেছি মায়ের মুখে। শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সবাই, হঠাৎ রাত ১২টার দিকে শুরু হলো ভীষণ গোলাগুলির শব্দ। এরপর কারফিউ উঠে যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যার খবর আসতে থাকে। নিরাপত্তার জন্য আমরা চলে আসি হাতিরপুলে, পরে সেখান থেকে সেন্ট্রাল রোডে দাদার বাসা দারুল আফিয়ায়।”

প্রতিবাদী কলমের কারণে দিতে হয়েছে প্রাণ

দেশের জন্য বাবার সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে তন্ময় বলেন, “দেশের জন্য কলম ধরার কারণে বাবা ১৯৪৫ সালে ৪ মাস জেলে ছিলেন। আর ভাষা আন্দোলনে সংশ্লিষ্টতা কারণে ১৯৫২ সাল থেকে তিন বছর জেলে ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকে বাবা সেটার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। প্রতিবাদী লেখালেখির জন্য ১৯৪৮ সাল থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হন।”

তন্ময় বলেন, “আমরা হয়তো বাবাকে চিনতে পারিনি, কিন্তু হানাদাররা চিনেছিল। ঠিক একইভাবে তারা চিনেছিল অন্য বুদ্ধিজীবীদেরও। নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে তারা চেয়েছিল বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে। বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে আমাদের চোখে অশ্রুও মিলিত হয়েছিল।”

/এম/
সম্পর্কিত
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রকৃত জনযুদ্ধ: স্পিকার
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়ে ভাঙচুর, চেয়ার-টেবিল-আসবাব-আলমারি লুট
৪৫ বছর পর স্বীকৃতি, বীরাঙ্গনা ফুলমতির শেষ বিদায় লাল-সবুজের পতাকায়
সর্বশেষ খবর
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত