শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন

কণ্ঠ স্তব্ধ করা গেলেও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়নি

আলী আসিফ শাওন
১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০০ আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০০

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে নিজ বাসা থেকে আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। চার দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর, রায়েরবাজার বধ্যভূমির একটি গণকবর থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ।

১৩ ডিসেম্বরের সেই সকালে ঢাকাজুড়ে ছিল কারফিউ। যুদ্ধের শেষপর্যায়ে অস্থির রাজধানীতে নিজের বাসার ছাদে বসে সেলিনা পারভীন লেখালেখিতে ব্যস্ত ছিলেন। এক হাতে তিনি সাত বছর বয়সি ছেলে সুমনের মাথায় তেল দিচ্ছিলেন, অন্য হাতে ছিল কলম। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও লেখাই ছিল তার প্রতিবাদ এবং সাহসের ভাষা।

হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস ও একটি লরি এসে থামে বাসার সামনে। মুখ ঢাকা কয়েকজন ব্যক্তি গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তার নাম জানতে চাইলে সেলিনা পারভীন কোনও দ্বিধা না করে নিজের পরিচয় দেন।

হানাদার ও তাদের দোসররা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় সেলিনা পারভীন ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “মামার সঙ্গে খেয়ে নিও সুমন, আমি এখনই ফিরে আসছি।” কিন্তু সেই ফিরে আসা আর হয়নি।

এরপর শুরু হয় বিভীষিকা। সেলিনার সঙ্গে আটক থাকা দেলোয়ার হোসেন পরবর্তী সময়ে জানিয়েছেন, বন্দিদশায় তিনি এক নারীর চিৎকার শুনেছিলেন, যা পরে বেয়নেটের আঘাতে স্তব্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার চার দিন পর যখন রায়েরবাজার বধ্যভূমির একটি গণকবর থেকে সেলিনা পারভীনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, তখন তার চোখ ও পেটে বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। সেদিনই আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সেলিনা পারভীনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ নোয়াখালীর কল্যাণনগর গ্রামে। জন্মসূত্রে তার নাম ছিল মনোয়ারা বেগম। পরে এফিডেফিড শিক্ষক পরিবারে জন্ম হলেও অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে এবং পরে ১৭ বছর বয়সে বিচ্ছেদ; তবে রক্ষণশীল সমাজে তালাকপ্রাপ্ত নারীর পরিচয় বহন করেও তিনি থেমে যাননি।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও জ্ঞানচর্চায় ছিলেন নিরলস। স্কুলশিক্ষক উমা দেবীর অনুপ্রেরণায় তিনি বাংলা সাহিত্যে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে এতিমখানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে কাজ করেন।
১৯৬২ সালে নিজের পছন্দে তিনি রাজনৈতিক কর্মী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে বিয়ে করেন। ১৯৬৬ সালে সাংবাদিকতায় তার পথচলা শুরু হয় সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় বেগম নূরজাহানের সহকারী হিসেবে। পরের বছর তিনি যোগ দেন ললনা পত্রিকায়। সেখানে তিনি পর্যায়ক্রমে প্রতিবেদক, সম্পাদক ও তহবিল সংগ্রাহকের দায়িত্ব পালন করেন।

পূর্বদেশ, আজাদ, সংবাদ, ডেইলি পাকিস্তান ও ইত্তেফাক-এ নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে তিনি একজন পরিচিত সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন—যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একজন নারীর জন্য ছিল বিরল।

সেলিনা পারভীন (ফাইল ছবি: সংগৃহীত)

১৯৬৯ সালে সেলিনা পারভীন প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক শিলালিপি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এই পত্রিকায় শামসুর রাহমান ও সিকান্দার আবু জাফরের মতো সাহিত্যিকদের লেখা প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধপন্থি কবিতা প্রকাশের কারণে পত্রিকাটি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কালো তালিকাভুক্ত হয় এবং ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেলিনা পারভীন তা প্রত্যাখ্যান করেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অনেকেই ঢাকা ছাড়লেও সেলিনা পারভীন থেকে যান। তার বাসা হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়কেন্দ্র। খাবার, ওষুধ ও অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দিতে থাকেন। শিলালিপি থেকে পাওয়া আয়ের অর্থও তিনি ব্যয় করেন মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও মিছিলে তিনি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের মতো বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্কও তাকে ঘাতক আল-বদর বাহিনীর নিশানায় পরিণত করে।

পরাজয় আসন্ন বুঝতে টেরে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে আল-বদর বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেই অভিযানের প্রথম দিকের ভু্ক্তভোগীদের একজন ছিলেন সেলিনা পারভীন। রায়েরবাজার ও মিরপুরের গণকবরগুলো আজও সেই নিষ্ঠুরতার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সেলিনা পারভীনের জীবন ও আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার লড়াই কেবল অস্ত্রের যুদ্ধ ছিল না, ছিল সত্য লেখার সাহসী সংগ্রামও। কলম হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সাহসী সাংবাদিকদের একজন ছিলেন সেলিনা পারভীন—যার কণ্ঠ স্তব্ধ করা গেলেও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়নি।

/এম/
সম্পর্কিত
আপিল বিভাগে সংবাদকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে এসআরএফের চিঠি
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা, তদন্ত নিয়ে পরিবারের প্রশ্ন
অভিবাসন সাংবাদিকতায় বিএনডব্লিউএলএ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড পেলেন ৪ সাংবাদিক
সর্বশেষ খবর
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
আইয়ুব বাচ্চুর অপ্রকাশিত গানের সংখ্যা কত, জানালেন তার স্ত্রী
আইয়ুব বাচ্চুর অপ্রকাশিত গানের সংখ্যা কত, জানালেন তার স্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত