ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিনই ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায় হত্যাকারী শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ দাউদ ওরফে রাহুল এবং তার সহযোগী মোটরসাইকেল চালক মো. আলমগীর শেখ।
রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের ১৮ দিন পর এ তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর পুলিশ, ডিবি, সিটিটিসি, র্যাব, সিআইডি ও বিজিবি জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে কাজ শুরু করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার দিনই শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীরকে শনাক্ত করা হয়। তাদের গ্রেফতারে সাভার, হেমায়েতপুর, আগারগাঁও ও নরসিংদীতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে একটি টিম ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত অভিযান চালায়।
নজরুল ইসলাম বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। মামলাটি নিবিড় তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, অস্ত্র লুকানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং পলায়নে সহায়তাকারীসহ মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন—ফয়সালের বাবা হুমায়ুন কবির, মা হাসি বেগম, স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, মো. কবির নুরুজ্জামান নোমানিয়া ওরফে উজ্জ্বল, সিবিয়ন দিও, সঞ্জয় চিসি, মো. আমিনুল ইসলাম রাজু, আব্দুল মান্নান ও আলমগীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিমন।
এ ঘটনায় জব্দ করা আলামতের মধ্যে রয়েছে—হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলি, ম্যাগাজিন, ছোরা, ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, ভুয়া নম্বর প্লেট, ঘটনার সময় ওসমান হাদিকে বহনকারী অটোরিকশা, ব্যবহৃত গুলির খোসা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রায় ৫৩টি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ২১৮ কোটি টাকার স্বাক্ষরিত চেক।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও গ্রেফতারকৃতদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই ফয়সাল ও আলমগীর ঢাকা থেকে সিএনজিযোগে আমিনবাজার যান। সেখান থেকে তারা মানিকগঞ্জের কালামপুর হয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি প্রাইভেটকারে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছান। শনাক্ত হওয়ার আগেই তারা সীমান্ত পাড়ি দিতে সক্ষম হন।
তিনি আরও জানান, হালুয়াঘাটের পূর্বে মুনফিলিং স্টেশনে ফিলিপ ও সঞ্জয় তাদের গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ফিলিপ তাদের সীমান্ত পার করে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পুত্তির কাছে হস্তান্তর করেন। পরে পুত্তি এক ট্যাক্সিচালক সামির মাধ্যমে তাদের মেঘালয়ের তুরা শহরে পাঠান। ইনফরমাল চ্যানেলে মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, পুত্তি ও সামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নজরুল ইসলাম বলেন, ধারণা করা হচ্ছে আসামিরা অবৈধ পথে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ছয় জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং চার জন সাক্ষী ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে পল্টন থানার বক্স কালভার্ট রোডে হামলার শিকার হন শরীফ ওসমান হাদি। মতিঝিল মসজিদ থেকে জুমার নামাজ শেষে প্রচারণা চালিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলে আসা দুজন হাদিকে লক্ষ্য করে চলন্ত অবস্থায় গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে তিনি মারা যান।









