রাজধানীর তেজতুরী বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহতের স্ত্রীর দাবি, মোসাব্বির বিভিন্ন সময় তাকে হত্যার হুমকি ও শত্রু বাড়ার বিষয় জানিয়েছেন। কিন্তু, কারা হুমকিদাতা বা শত্রু সে সম্পর্কে কখনও কিছু জানাননি। হুমকির ঘটনায় তিনি কোনও দিন পুলিশের শরণাপন্ন হননি।
পুলিশ বলছে, আধিপত্য বিস্তার, পূর্ব শত্রুতা, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক বিরোধসহ সম্ভাব্য সব দিক সামনে রেখে তদন্ত করছে তারা। পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত এবং গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
৭ জানুয়ারি রাত ৮টার কিছু সময় পর তেজতুরী বাজারের হোটেল সুপারস্টারের পাশের আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে দুর্বৃত্তরা মোসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় স্বেচ্ছাসেবক দলের এই নেতা ও তেজগাঁও থানার ভ্যান-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। পরে স্থানীয় লোকজন মোসাব্বিরকে উদ্ধার করে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে গেলে যাচাই-বাছাই শেষে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আর মাসুদকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি সেখানেই রয়েছেন।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। নির্দিষ্ট করে কারও নাম ছিল না মামলায়।
এদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মোসাব্বিরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. আয়শা পারভীন ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নিজ এলাকায় আরেক দফা জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব সদ্য প্রয়াত মোসাব্বির পশ্চিম কাওরান বাজারের গার্ডেন ভিউ এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। তার দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রী রয়েছেন। তার বাবার নাম খলিলুর রহমান।
ময়নাতদন্তের আগে তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. হায়দার আলী মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। তিনি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিহতের পেটের ডান পাশে আধা ইঞ্চি পরিমাণ একটি গুলির ছিদ্র, ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে আরেকটি ছিদ্র এবং বাম হাঁটুতে ছিলা জখম পাওয়া গেছে।
মরদেহ বুঝে নেওয়ার সময় মর্গের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হয় নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের। তিনি বলেন, “তিনি প্রায়ই বলতেন তার অনেক শত্রু তৈরি হয়েছে এবং যেকোনও সময় তাকে হত্যা করা হতে পারে। তবে, কখনও নির্দিষ্ট কারও নাম বা কোনও হুমকির কথা জানাননি।”
এই নারীর দাবি, রাজনৈতিক মামলার বাইরে কারও সঙ্গে মোসাব্বিরের ব্যক্তিগত কোনও শত্রুতা ছিল না। অতিরিক্ত সরলতাই হয়তো তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুরাইয়া বলেন, “মোসাব্বির বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় পাঁচবার কারাভোগ করেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি জামিনে মুক্তি পান। জামিনে মুক্তির পর নিরাপত্তাজনিত কারণে কাওরান বাজারের বাসা ছেড়ে পরিবারসহ মেরাদিয়া এলাকায় বসবাস শুরু করেন। মাঝে মাঝে বসুন্ধরার পেছনে কাজীপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতেও থাকতেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি ও পানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”
ঘটনার সময় মোসাব্বিরের কাছে থাকা দুটি মোবাইল ফোন এখনও উদ্ধার হয়নি বলেও জানান তার স্ত্রী। বলেন, “আমি চাই আমার স্বামী হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক। যেন আর কোনও পরিবারকে এমন ঘটনার শিকার হতে না হয়।”
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এখন পর্যন্ত বলার মতো নির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। তবে চাঁদাবাজি, পূর্ব শত্রুতা, রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারসহ সব সম্ভাব্য দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।”
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শাহ্ ইবনে মিজান বলেন, “নিহতের স্ত্রীর কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কোনও পূর্ববর্তী জিডি না থাকায় সব দিক পর্যালোচনা করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”









