রাজধানীর উত্তরায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে বাড়ি ফিরেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী আবিদুর রহিম (১২)। ৩৫টি অস্ত্রোপচার শেষে বুধবার (২১ জানুয়ারি) হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায় সে। আবিদ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বুধবার দুপুরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক নাসির উদ্দিন।
তিনি জানান, গত বছরের ২১ জুলাই দুর্ঘটনার দিন থেকেই আবিদুর রহিম তাদের এখানে চিকিৎসাধীন ছিল। মোট ১৮০ দিন তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় যেসব ৩৫ জন আহত হয়ে এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে আবিদ ছিল সর্বশেষ রোগী। তার শরীরের ২২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। যদিও শতাংশের হিসাবে এটি কম মনে হতে পারে, তবে তার সঙ্গে ইনহেলেশন বার্ন, মুখ ও হাতের গুরুতর দগ্ধতা ছিল। ঘটনার সময় সে শ্রেণিকক্ষের সামনের দিকে অবস্থান করছিল।
চিকিৎসার বিস্তারিত তুলে ধরে অধ্যাপক নাসির উদ্দিন বলেন, শুরুতে আবিদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তাকে পাঁচ দিন আইসিইউতে এবং পরে ছয় দিন হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখতে হয়। এরপর ১৭২ দিন কেবিনে চিকিৎসা চলে। দুই হাত দগ্ধ হওয়ায় ফ্যাসেকটমি করে চামড়া কেটে দিতে হয়েছিল, যার মাধ্যমে তার হাত রক্ষা করা সম্ভব হয়। মোট ৩৫ বার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে—এর মধ্যে ২৩ বার ছোট অপারেশন এবং ১০ বার স্কিন গ্রাফট করা হয়েছে। মুখ ও হাতের ফ্ল্যাপ কভারেজও করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় হাসপাতালের বেডে থাকার কারণে সে সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত ছিল, যা তার শরীরে বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। এখন তাকে নিয়মিত থেরাপি নিতে হবে, যা বাসায় গিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, আজ আমাদের জন্য আনন্দের দিন। আবিদ আজ বাড়ি ফিরছে। এই চিকিৎসায় যুক্ত সব চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। স্বাভাবিক সময়ে আট ঘণ্টার ডিউটি থাকলেও তখন আমাদের কোনও সময়সীমা ছিল না। সবাই স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করেছেন। ছয় মাস হাসপাতালে থাকা একটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক বেশি। যদিও অনেকে আর্থিক সহায়তা দিতে চেয়েছিলেন, তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তা গ্রহণ করিনি।
অধ্যাপক নাসির উদ্দিন বলেন, এত বড় ঘটনায় সাংবাদিকদের সহযোগিতাও তারা পেয়েছেন। ভবিষ্যতে এমন বড় দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা দিতে উন্নতমানের চিকিৎসা সামগ্রী ব্যবহারের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, যেসব রোগী ইতোমধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন, তাদের অন্তত দুই বছর নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিতে হবে। সপ্তাহ, পনেরো দিন বা মাসভিত্তিক চিকিৎসা ও থেরাপি চলবে। এজন্য একটি বিশেষ সেলও খোলা হয়েছে।
আবিদুর রহিমের বাবা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছয় মাস পর আমার ছেলে বাড়ি ফিরছে—এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আজ কেমন লাগছে, সে বলেছে—‘বাবা, আজ আমার ঈদের মতো লাগছে।’ চিকিৎসক, নার্সসহ সবাই আমাদের যে সহযোগিতা করেছেন, তাতে আমরা অভিভূত।
তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আহত ও নিহতদের জন্য ঘোষিত ক্ষতিপূরণ এখনো দেওয়া হয়নি। ঘোষিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ পুনর্নির্ধারণের দাবি জানান তিনি। হাসপাতাল থেকে ফেরার পরও যে চিকিৎসা ব্যয় রয়েছে, তা বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন।
এদিকে হাসপাতাল ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলতে গিয়ে আবিদ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। “আজ আমি হাসপাতাল থেকে চলে যাচ্ছি”—একথা বলেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২১ জুলাই বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওপর পড়ে। ওই ঘটনায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জনের মৃত্যু হয় এবং ৩৬ জন চিকিৎসা নেন।









