আন্তর্জাতিক নারী দিবস

বানরের তৈলাক্ত বাঁশ ও পাটিগণিতের ফেরে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন

উদিসা ইসলাম
০৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০

নব্বইয়ের দশকে পাটিগণিতের বইয়ে একটি অঙ্ক নিয়ে বন্ধুমহলে কথা হয়নি, এমন স্মৃতি বিরল। একটি বানর একটি তৈলাক্ত বাঁশে উঠতে থাকে। সে প্রতি মিনিটে ৩ হাত উপরে ওঠে, কিন্তু বাঁশ তৈলাক্ত হওয়ায় আবার ২ হাত নিচে পিছলে যায়। যদি বাঁশের উচ্চতা ২০ হাত হয়, তবে বানরটি কত সময়ে বাঁশের মাথায় পৌঁছাবে?

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাস যেন তেমনই এক তৈলাক্ত বাঁশের হিসাব-নিকাশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে— একদিকে অর্জন, অপরদিকে প্রতিরোধ। এক ধাপ এগোলেই যেন দুই ধাপ পিছিয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়। একদিকে নারীর অধিকার বাস্তবায়নের জন‍্য কমিশন গঠন, আরেকদিকে সেই কমিশনের প্রতিবেদন কোনোভাবেই বাস্তবায়নের বাস্তবতা থাকবে না। অনেকেই এই অবস্থাকে তুলনা করেন “বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার” সঙ্গে— যেখানে উপরে ওঠার প্রতিটি প্রচেষ্টাই পিছলে পড়ার ঝুঁকিতে ভরা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যারা বাংলাদেশে নারী আন্দোলনে যুক্ত, তারা এরপরেও হতাশা ব্যক্ত করতে চান না। লড়াইটা চালিয়ে যাওয়া এবং এই যে পিছিয়ে পড়া সবই জয়ের পথে এগোনো বলে মনে করেন তারা।

স্বাধীনতার পর সংবিধানে সমঅধিকারের স্বীকৃতি থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নারীর দৃশ্যমান অগ্রগতি— সব মিলিয়ে অর্জনের তালিকা ছোট নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অংশগ্রহণও নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে বাস্তবতার আরেকটি চিত্র সামনে আসে। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিবাহ ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ থেমে নেই। আইনি কাঠামো শক্তিশালী হলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতির কথা বলছেন অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, আইন আছে— কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ, সামাজিক চাপ প্রবল, আর ভুক্তভোগীর কণ্ঠ প্রায়ই নিঃসঙ্গ এবং রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমছে।

নারীবাদী গবেষকরা বলছেন, এই “এক ধাপ এগোনো, দুই ধাপ পিছু হটা” কেবল সামাজিক মানসিকতার প্রশ্ন নয়। এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। উন্নয়ন-ভিত্তিক সূচকে নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও সিদ্ধান্তগ্রহণের স্তরে তাদের প্রভাব এখনো সীমিত।

জনপ্রতিনিধি হিসেবে নারীর সংখ‍্যা কমে গেল

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লষণে দেখা যায়, ১৯৭৩-১৯৭৫ মেয়াদের প্রথম জাতীয় সংসদে ১৫টি সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধিরাই ছিলেন সংসদের নারী প্রতিনিধিত্ব। ১৯৭৯-১৯৮২ মেয়াদে দ্বিতীয় সংসদে ২ জন নির্বাচিত ও ৩০টি নারী আসন মিলিয়ে মোট ৩২ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৮৮-৯০ মেয়াদে চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল না। ৪ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৯১-১৯৯৫ মেয়াদে পঞ্চম সংসদে ৫ জন নির্বাচিতসহ ৩৫ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। ৩০টি সংরক্ষিত আসন ছিল। ওই নির্বাচনটি বাতিল হয়ে ওই বছরের জুন মাসে সপ্তম সংসদ নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত হন ৮ নারী। মোট নারী প্রতিনিধি ছিলেন ৩৮ জন। অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে ৭টি আসনে সরাসরি ও ৪৫টি সংরক্ষিত আসনসহ মোট ৫২ জন নারী সংসদ সদস্য হন। নবম জাতীয় সংসদে ২১ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। এরপর সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। ওই সংসদে মোট নারী সংসদ সদস্য হন ৭০ জন। আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের নির্বাচনে যথাক্রমে ১৮, ২৩ ও ১৯ জন নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নারী শ্রমিক ও দৃশ্যমানতা কমছে

দেশে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৫টি দৈনিক জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পরিষদের তথ্যমতে, নির্যাতনের শিকার হওয়াদের মধ্যে ১ হাজার ২৩৪ জন কন্যা ও ১ হাজার ৫৭৪ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে। গত বছরে দেশে মোট ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যা ও ২৪৩ জন নারী। ইউএন উইমেনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, লেবানন ও জর্ডানে প্রেরিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় কোথাও অর্ধেকে, কোথাও এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। বিদেশি শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমার পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতেও নারীর উপস্থিতি হ্রাস পাচ্ছে।

নারী অধিকার আন্দোলনে এক পা এগোলে, দুই পা পিছায়, দুই পা এগোলে তিন পা পিছায় বলে নারী হিসেবে আমাকে সবসময়ই এক ধাপ পিছেয়েই রাখা হয় উল্লেখ করে নারীনেত্রী খুশি কবীর বলেন, ‘‘তারপরেও এই যে মানুষ কথা বলছে, তারা অধিকার বুঝে নেওয়ার কথা বলছে— তখন বেশ আশান্বিত হই। যারা নারী অধিকার আন্দোলনের মধ‍্যে একধরনের প্রক্রিয়ার মধ‍্যে আছেন, কেবল তারাই কথা বলছেন এমন না। এই প্রক্রিয়ার বাইরের মানুষও এসব আলোচনা উত্থাপন করছেন। আমরা অনেক জায়গায় রক্ষনশীল, বদ্ধ চিন্তার মধ‍্যে আটকে গিয়েছি, তারপরেও আমি হতাশ না।’’

গার্মেন্টস সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার এই যে অর্জন ও সেখান থেকে প্রতিরোধে পড়ার বিষয়টাকে ঠিক পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখতে চান না। তিনি বলেন, ‘‘আগে অর্থনীতিতে মুক্তিলাভকে নারীর স্বাধীনতা হিসেবে দেখা হতো। সেই ভাবনার গন্ডিটা আমরা পার হয়ে গেছি। এখন শিক্ষিত, সামলম্বী নারীরা আমাদের সামনে আছেন। এখন তার অর্থনীতিতে মুক্তির পাশাপাশি দরকার নাগরিক পরিচয় তৈরি হওয়া।  সেখানে মধ‍্যবিত্ত সীমানা অতিক্রম করে নাগরিক পরিচয় গড়ে তুলতে হবে।’’ এতদিনেও আমরা সেদিকে যেতে না পারার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘নারী আন্দোলনে ঐক‍্যবদ্ধতার অভাব আছে। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি না হলে এগুলো এগোবে না। সিদ্ধান্তগ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে আমরা এখনও পিছিয়ে আছি।

গ্রাম থেকে শহর— সব জায়গাতেই নারী সংগঠনগুলো সচেতনতা, আইনি সহায়তা ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে কাজ করছে। কিন্তু তাতে সমাজ কতটা বদলেছে প্রশ্নে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফৌজিয়া মোসলেম বলেন, ‘‘একেবারেই যে এগোয়নি এটা বলা যাচ্ছে না। এতকিছুর ভেতরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম উজ্জ্বল নারীদের সামনে আসতে দেখছি আমরা। অগ্রগতি না হলে এই দৃশ্যমানতা তৈরি হতো না। নারীর এগিয়ে যাওয়ার কারণেই বিরোধীরাও নারী ইস্যুকে অ্যাড্রেস করতে বাধ্য হচ্ছে, সেটাকেও আমি বিবেচনায় নিতে চাই। তবে যতটা সুফল পাওয়ার কথা ছিল, ততটা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ প্রথা, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো নারী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার জায়গাগুলোতে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এবারের যে প্রতিপাদ্য রাইটস, জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকশন— সেটা এই সময়ের জন্য উপযোগী। আমাদের আরও কাজ বাকি আছে।’’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে পিছিয়ে বাংলাদেশ
দুর্গম চরে নিরাপদ মাতৃত্বে নতুন দিগন্ত
ঢাকার যেসকল মসজিদে থাকছে নারীদের ঈদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা
সর্বশেষ খবর
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলার কথা স্বীকার ট্রাম্পের
সোনাক্ষির সুস্থতায় কাজে লাগছে হোমিওপ্যাথি, বিতর্কে নেটিজেনরা
সোনাক্ষির সুস্থতায় কাজে লাগছে হোমিওপ্যাথি, বিতর্কে নেটিজেনরা
নিজের বিড়ালকে আলিঙ্গন করার দিন আজ
নিজের বিড়ালকে আলিঙ্গন করার দিন আজ
স্পেনের ৭২ বছরের পেনাল্টি আধিপত্যের ইতি যেভাবে
স্পেনের ৭২ বছরের পেনাল্টি আধিপত্যের ইতি যেভাবে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের