চতুর্থবারের মতো শূন্য কমিশন, আবারও স্থবির দুদকের কার্যক্রম

জামাল উদ্দিন
০৮ মার্চ ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ২২:০০

গত ৩ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার (মোহাম্মদ আলী আকবর আজিজি ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ) পদত্যাগ করেন। এর ফলে কমিশন সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে। এতে করে ফের স্থবির হয়ে পড়েছে দুদকের কার্যক্রম। মোমেন কমিশনের পদত্যাগের ফলে দুদকে চতুর্থবারের মতো এমন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।

কমিশনের অনুপস্থিতিতে মামলা, অনুসন্ধান, তদন্ত, অভিযানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কে নেবে, সেটি দুদক আইন বা বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় বারবার প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে চলমান অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং কিছু নিয়মিত রুটিন কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যত থমকে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরবর্তী কমিশনের অনুমোদন নেওয়ার শর্তে কমিশনের অনুপস্থিতিতে সচিবের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী কাঠামো গঠন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি অথবা সচিবের নেতৃত্বে দুদকের আটজন মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়ে গঠিত একটি কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী কোনও কমিশনার রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের লিখিত নোটিশ দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। একই আইনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে যেসব কারণে এবং যে পদ্ধতিতে অপসারণ করা যায়, একই কারণে ও পদ্ধতিতে দুদক কমিশনারদের অপসারণ করা যাবে। এর বাইরে অন্য কোনোভাবে কমিশনারকে অপসারণের সুযোগ নেই।

বাস্তবে দেখা গেছে, বেশিরভাগ কমিশনই নির্ধারিত নোটিশ পিরিয়ড পূরণ না করেই পদত্যাগ করেছে। এছাড়া নতুন কমিশন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কমিশনের অনুপস্থিতিতে কীভাবে সংস্থার কার্যক্রম চলবে, এ বিষয়েও আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, “সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পরিবর্তন ঘটে বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে কমিশন কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।”

দুদক সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গঠিত সাতটি কমিশনের মধ্যে চারটিই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খানকে চেয়ারম্যান করে প্রথম কমিশন গঠন করা হয়। তবে, ২০০৭ সালের ১/১১–এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে। দ্বিতীয় কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এ কমিশনও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়।

২০০৯ সালে অবসরপ্রাপ্ত সচিব গোলাম রহমানকে চেয়ারম্যান করে তৃতীয় কমিশন গঠন করা হয়। চতুর্থ কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান। পঞ্চম কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক সচিব ইকবাল মাহমুদ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গঠিত এ তিনটি কমিশনই পুরো মেয়াদ সম্পন্ন করতে পেরেছিলো।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২৯ অক্টোবর ষষ্ঠ কমিশন পদত্যাগ করে। ওই কমিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং কমিশনার মো. জহুরুল হক ও মোছা. আছিয়া খাতুন সেদিনই পদত্যাগ করেন। এরপর টানা ৪২ দিন দুদকে কোনও কমিশন ছিল না। এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সংস্থার কার্যক্রমও একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ১০ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন আবদুল মোমেন। অন্য দুই কমিশনার যথাক্রমে ১১ ও ১৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “হঠাৎ করে দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগ হতাশাজনক হলেও তা অপ্রত্যাশিত নয়। দেশের রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি সংস্থাগুলোকে পছন্দের নেতৃত্বের আওতায় রাখার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের।”

তিনি বলেন, “দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত রাখার বাস্তব অনুশীলন এখনও ক্ষমতার কাঠামোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এখন দেখার বিষয়, মোমেন কমিশনের উত্তরসূরি হিসেবে কারা আসছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয় এবং দুদকের স্বাধীনতা নিয়ে ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়।”

/এবিএম/
সম্পর্কিত
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
নিয়োগ-টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ: এলজিইডির সাবেক পিডির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে দুদক
‘সমন্বয়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন হান্নান মাসউদ’ 
সর্বশেষ খবর
বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান, নিয়োগ পেলেন তিন কমিশনার
বিএসইসি’র নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান, নিয়োগ পেলেন তিন কমিশনার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের বিজয়ে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের বিজয়ে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭টি ওয়ার্ড
ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭টি ওয়ার্ড
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের