জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলুপ্ত, কমিশনারদের খোলা চিঠি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪৬ আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৪৬

জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলুপ্ত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হওয়ার পর কমিশন বিলুপ্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিলুপ্ত কমিশনের কমিশনার মো. নূর খান। এ বিষয়ে শিগগিরই সরকার গেজেট প্রকাশ করবে। 

মো. নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমিশনটি গঠন করা হয়েছিল, সেটি বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কমিশন বিলুপ্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে পদত্যাগের কোনও প্রয়োজন নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিলুপ্ত কমিশনের সদস্যরা একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। এতে সই করেছেন বিলুপ্ত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, কমিশনার মো. নূর খান, ইলিরা দেওয়ান, অধ্যাপক মো. শরিফুল ইসলাম ও ড. নাবিলা ইদ্রিস। 

খোলা চিঠিতে তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা বারবার জানতে চাইছেন— “এখন আমাদের কী হবে?” তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে।  

চিঠিতে বলা হয়, তারা পাঁচজন সদ্যবিদায়ী মানবাধিকার কমিশনার। নিজ নিজ কর্মজীবনে মানবাধিকার সুরক্ষায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই ভুক্তভোগীদের বেদনা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বাস্তবতা এবং আইনাঙ্গনের জটিলতা সম্পর্কে তারা অবগত। কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তারা এই অবস্থান তুলে ধরছেন।  

সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব  

চিঠিতে বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে মূল আইন উল্লেখ করে বলা হয়, এর ওপর ভিত্তি করেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছিল। ফলে আলোচ্য তিনটি অধ্যাদেশ পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

প্রথমত, সংসদে বলা হয়েছে গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর। 

বাস্তবে, অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ও জরিমানার বিধান রয়েছে। 

দ্বিতীয়ত, তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি নেই, এমন দাবি করা হয়েছে। 

চিঠিতে বলা হয়, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন না দিলে শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। বরং পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের আইনে এসব বিষয় অনুপস্থিত। 

তৃতীয়ত, সংসদে বলা হয়েছে আইসিটি আইনই যথেষ্ট এবং গুম অধ্যাদেশ আইসিটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।  

কমিশনাররা বলেন, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার করতে পারে; বিচ্ছিন্ন গুমের বিচার তার আওতায় পড়ে না। গুম অধ্যাদেশে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুমের বিচার আইসিটির এখতিয়ারেই রাখা হয়েছিল। ফলে দুই আইনের মধ্যে সাংঘর্ষিকতার প্রশ্ন ওঠে না।  

চিঠিতে আরও বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার ফলে ১১ এপ্রিলের পর সংঘটিত নতুন কোনও গুম ফৌজদারি আইনে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকছে না, ফলে ভুক্তভোগীরা কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। 

সংসদে জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও কমিশনাররা বলেন, অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক প্রতিরোধে সংঘটিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সুরক্ষা থাকলেও বিশৃঙ্খলার সুযোগে সংঘটিত হত্যার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রয়োজন ছিল, যা মানবাধিকার কমিশন করতো। কিন্তু পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের নেই।  

তারা বলেন, কমিশন তদন্ত করে আবার নিজেই বাদী হওয়া পক্ষপাতমূলক, এমন অভিযোগও সঠিক নয়। তদন্তকারী পুলিশও নিয়মিত বাদী হয়, কিন্তু বিচারকের ভূমিকা পালন করে না; কমিশনের ক্ষেত্রেও একই কাঠামো প্রযোজ্য ছিল। 

এছাড়া ২০০৯ ও ২০২৫ আইনকে সমান স্বায়ত্তশাসিত বলা হলেও বাস্তবে ২০০৯ আইনে কমিশনের কার্যকর তদন্তক্ষমতা সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়। 

সরকারের প্রকৃত আপত্তি  

সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে কমিশনাররা বলেন, সরকারের আপত্তির মূল লক্ষ্য ছিল কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা সীমিত করা। 

প্রথমত, কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখার প্রস্তাব কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পরিপন্থি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, অডিটর জেনারেল ও নাগরিক সমাজের কাছে জবাবদিহি করতো। কিন্তু ২০০৯ আইনে কমিশন কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে গেছে। 

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির দাবি। কমিশনারদের মতে, সরকারি বাহিনী অভিযুক্ত হলে সরকারের অনুমতিক্রমে তদন্ত কার্যকর হতে পারে না। 

তৃতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩(২)-এর সঙ্গে অসঙ্গত। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা হলে সেটি গুম নয়, এ বিধান ইতোমধ্যে সংবিধানেই নির্ধারিত। 

চতুর্থত, বাছাই কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ফলে কমিশনার নিয়োগে দলীয়করণের ঝুঁকি বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।  

ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান নিয়ে প্রস্তাবনা  

খোলা চিঠিতে বলা হয়, সরকারের বক্তব্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে শক্তিশালী আইন তৈরির কথা বলা হচ্ছে, অপরদিকে বিশেষ কমিটিতে উত্থাপিত আপত্তিগুলো মানলে আইন অনিবার্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।   

কমিশনাররা উল্লেখ করেন, অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে ৬০০-এর বেশি অংশীজন পরামর্শ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারাও ছিলেন। অধ্যাদেশ বাতিল না করেও সংশোধনের সুযোগ ছিল বলে তারা মত দেন।  

চিঠিতে আরও বলা হয়, গুমবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ আইসিপিপিইডি-তে স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য। ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার আইনকে শক্তিশালী করছে, নাকি দুর্বল করছে— সেদিকেই ভুক্তভোগীদের নজর থাকবে।  

শেষে কমিশনাররা বলেন, বহু পরিবার এখনও অপেক্ষায় আছে প্রিয়জনের খবরের জন্য। “এখন আমাদের কী হবে?” এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, কার্যকর ও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই দিতে হবে। 

/জেইউ/এসটি/  
সম্পর্কিত
নেপোলিয়নের গোপন চিঠির রহস্যভেদ করলো এআই, ২০০ বছর পর কী জানা গেলো?
আ.লীগ নেতাকে বিএনপির কর্মী দাবি করে প্রত্যয়ন, দুই নেতার পদ স্থগিত
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমানের স্টুডিওতে হামলা, বিচার দাবি এইচআরএসএসের
সর্বশেষ খবর
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন