বাংলাদেশে যখন স্টারলিংক চালু হয়, তখন এটি নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছিল। পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে চরাঞ্চল কিংবা গভীর সমুদ্র— দেশের দুর্গমতম প্রান্তেও নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এই স্যাটেলাইট সেবা।
কিন্তু প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই উচ্চাশা আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক ও গ্রাহকদের মতে, স্টারলিংক এখনও মূলত করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে— সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে এর বিস্তার খুবই সামান্য।
মূল বাধা: দাম ও বিদ্যমান অবকাঠামো
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকাশছোঁয়া দাম, প্যাকেজের গঠন এবং দেশে বিদ্যমান ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের শক্তিশালী অবস্থানই স্টারলিংকের প্রসারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের শহর ও আধা-শহর এলাকায় ফাইবার অপটিক ইন্টারনেটের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান।
‘ফাইবারের বিকল্প নয়, পরিপূরক’
স্টারলিংকের বাজার প্রসঙ্গে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার শাহ আহমেদুর কবির জানান, বাংলাদেশে স্টারলিংকের যাত্রা দ্রুত শুরু হলেও বাজার পেতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, “ফাইবার নেটওয়ার্কের শক্তিশালী কাঠামোর কারণে আমাদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমরা কখনোই স্টারলিংককে ফাইবারের বিকল্প ভাবছি না; এটি বরং একটি পরিপূরক প্রযুক্তি। দুর্গম পাহাড়, দ্বীপ বা অফশোর জোনে যেখানে ফাইবার পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানেই এর প্রকৃত প্রয়োজন।”
প্যাকেজ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আনলিমিটেড ডাটায় অভ্যস্ত। কিন্তু এখানে ক্যাপড (সীমিত) প্যাকেজ ব্যবহারের ধারণাটি নতুন। আমরা ডাটা-পুল মডেল নিয়ে কাজ করছি যাতে দীর্ঘমেয়াদে ডাটা ব্যবহারের সুযোগ আরও নমনীয় হয়। আশা করছি আগামী ছয় মাসের মধ্যে গ্রাহকবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্যাকেজ আনা সম্ভব হবে।”
কৌশলগত সংযোগের হাতিয়ার
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) সিনিয়র ম্যানেজার আসাদ বিন ইউসুফ বলেন, স্টারলিংক জাতীয় ডিজিটাল কৌশলেরই একটি অংশ।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে পরিবহন ও নৌ-খাতে এর পাইলট প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা রেলওয়ে এবং সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এর পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করেছি। উপকূলীয় অঞ্চলে জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ (ট্র্যাকিং), মনিটরিং এবং ইআরপি সিস্টেমে উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।” এমনকি যেখানে ফাইবার অপটিক সংযোগ ব্যয়বহুল, সেখানে স্টারলিংক ব্যবহার করে বিপিও বা পোশাক কারখানার মতো নতুন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।
গ্রাহক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্বেগ
মোবাইল ফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, কেবল দাম নয়, বরং সেবার কাঠামো ও জবাবদিহিও একটি বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, “যেখানে ফাইবার ব্রডব্যান্ড ৫০০ থেকে ১২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে স্টারলিংকের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জন্য অবাস্তব। এছাড়া ডাটা ক্যারি-ফরোয়ার্ড সুবিধা না থাকা এবং বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ কোনও সার্ভিস সেন্টার না থাকা বড় ঘাটতি। বিতরণ ব্যবস্থা পার্টনারদের হাতে থাকায় কারিগরি সমস্যায় বিলম্বের শিকার হতে হয় গ্রাহকদের।”
তিনি আরও জানান, কিট বা সেবার মূল্য এখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্ধারণ করে দেয়নি, যা কোম্পানি-চালিত একটি বাজার কাঠামো তৈরি করছে।
তিনি সরকারি নীতিমালার প্রচারণার সঙ্গে গ্রাহক অভিজ্ঞতার অসংগতির বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “সরকারি পর্যায়ে এ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ফলে কিছু গ্রাহকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।”
গ্রাহকের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ঢাকার মোহাম্মদপুরের চাকরিজীবী রেজাউল করিম বলেন, “আমরা ৮০০ টাকায় আনলিমিটেড ইন্টারনেট ব্যবহার করছি, সেখানে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে নতুন সেবা নেওয়া কঠিন।”
তবে রাজশাহীর ফ্রিল্যান্সার তানভীর হোসেন মনে করেন, যদি স্থায়িত্ব ও গতি নিশ্চিত হয়, তবে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটি সহায়ক হতে পারে; তবে অবশ্যই দাম কমাতে হবে।
চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সাবিনা ইয়াসমিনও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, “আমরা অনলাইন ব্যবসা করি, কিন্তু প্রায়ই ইন্টারনেটের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। স্টারলিংক যদি সাশ্রয়ী হয়, তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বড় সহায়ক হতে পারে।”
অপরদিকে বরিশালের কলেজ শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম গ্রামীণ জনপদের দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, “গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটের মান এখনও বেশ দুর্বল। এই প্রযুক্তি সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।”
করপোরেট খাতে নীরব প্রসার
সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিস্তার কম হলেও করপোরেট সেক্টরে স্টারলিংকের ব্যবহার বাড়ছে।
একটি আন্তর্জাতিক লজিস্টিক কোম্পানির আইটি ম্যানেজার জানান, ফাইবার লাইন কাটা পড়লে ব্যাকআপ হিসেবে তারা এটি ব্যবহার করছেন। সমুদ্রগামী জাহাজের কর্মকর্তারাও রিয়েল-টাইম কানেক্টিভিটির জন্য স্টারলিংককে নির্ভরযোগ্য মনে করছেন।
কারিগরি ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্টারলিংকের কার্যকারিতা মূলত আকাশের সঙ্গে সরাসরি ও স্বচ্ছ সংযোগের (ক্লিয়ার লাইন-অফ-সাইট) ওপর নির্ভরশীল। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ শহর বা ঘন জঙ্গলঘেরা এলাকায় এর পূর্ণ সুবিধা পাওয়া কিছুটা কঠিন। এছাড়া ‘মোবাইল ব্যাকহলিং’-এর ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ থাকায় দেশের সামগ্রিক টেলিকম অবকাঠামোর সঙ্গে এর সমন্বয় ব্যাহত হচ্ছে, যা দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা ও বাজারের পূর্বাভাস
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আমাজনের ‘প্রজেক্ট কুইপারের’ মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে প্রবেশ করলে এই খাতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এতে মূলত তিনটি সম্ভাবনা তৈরি হবে— ইন্টারনেটের খরচ বা দাম কমবে, সেবার মান উন্নত হবে, গ্রাহক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তবে বাংলাদেশে স্টারলিংকের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে— সাশ্রয়ী মূল্য নির্ধারণ, স্থানীয় চাহিদাপযোগী ডাটা প্যাকেজ এবং নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক সেবার সম্প্রসারণ।
সামগ্রিক বিষয়ে শাহ আহমেদুর কবিরের মন্তব্য হলো— “বাংলাদেশে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হলেও তা হবে পর্যায়ক্রমিক। যেখানে ফাইবার পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে স্টারলিংক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”
আপাতত স্টারলিংক বাংলাদেশে একটি বিপুল সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে থাকলেও এর বিস্তার এখনও সীমাবদ্ধ। এটি বর্তমানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং অবকাঠামোগত বাস্তবতার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
উল্লেখ্য, এক বছর আগে ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত একটি বিশেষ সামিটে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো স্টারলিংকের পরীক্ষামূলক ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়। এটি ইলন মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স-এর একটি প্রকল্প।









