ডিজিটাল আইন পুনর্বিবেচনার দাবি

মত প্রকাশ ও ব্যক্তি-গোপনীয়তা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৭ আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৭

সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া ডিজিটাল আইনগুলো মানুষের মত প্রকাশ ও ব্যক্তি-গোপনীয়তার জন্য এখনেও ঝুঁকিপূর্ণ এবং অধিকার রক্ষায় প্রতিটি আইনই পুনরায় পর্যালোচনা করা দরকার। 

ডিজিটাল রাইটস এশিয়া-প্যাসিফিক বাংলাদেশ জাতীয় সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নিয়ে এমন মত দেন বক্তারা। তারা বলেন, “অংশীজনদের মতামত ছাড়াই আইনগুলো দ্রুত পাস করা হয়েছে এবং ব্যাপক ডিজিটাল নজরদারির সুযোগ আছে এমন কিছু ধারা বহাল রাখা হয়েছে।” 

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের আয়োজন করে ইন্টারনেটে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইট ও এনগেজ মিডিয়া। ‘অর্থবহ, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন প্রণয়ন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সেশন পার্টনার ছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও ডিনেট।  

প্রথম প্লেনারি অধিবেশনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “নতুন আইনগুলোতে নানা অসংগতি আছে এবং এই আইনগুলো জুলাইয়ের চেতনা বা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা দলের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পুরোনো আইনগুলোই আসলে নতুন নামে আবার আনা হয়েছে, যা মানুষের ক্ষমতায়নে তেমন সহায়ক হয়নি। অথচ সংসদের নেতাদের অনেকেই অতীতে এমন আইনের অপব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন, তবুও তারা একই ধরনের আইন প্রণয়ন করেছেন।” 

এই অধিবেশনে পাস হওয়া আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক গণ-নজরদারির যে কাঠামো তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানান অন্য বক্তারা।  

এসময় ডেইলি স্টারের জয়েন্ট এডিটর আশা মেহরীন আমিন বলেন, “ফেসবুক পোস্টের কারণে আগে যেভাবে মামলা হতো, এই সরকারের সময়েও একইভাবে মামলা হতে দেখা যাচ্ছে। আগে সাংবাদিকেরা যেমন নজরদারির ঝুঁকিতে ছিলেন, এখনও তেমন ঝুঁকিতে আছেন।” 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই আইনগুলো তৈরি হয়েছে এবং নতুন সরকার কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই সেই আইনগুলো কিছুটা সংশোধিত আকারে তড়িঘড়ি করে পাস করেছে। এতে আগের অধ্যাদেশের দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে এবং সরকারের জবাবদিহির জায়গাগুলোও আরও দুর্বল হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন বক্তারা।  

বাংলাদেশে ইউনেস্কোর হেড অব রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ বলেন, “প্রতিটি আইনকে সমাজের নিরিখে যাচাই করা প্রয়োজন। নতুন সরকার যেন আইনগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে মানবাধিকার রক্ষার জায়গাগুলো উন্নততর করার ‍সুযোগ কাজে লাগায়।” 

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, “এই আইনগুলো দরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও সমস্যা থাকলে তা পরে সংশোধন করা যাবে এবং সরকার ইতোমধ্যে সেগুলো উন্নত করার জন্য কাজ করছে।” 

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় সেশনে অংশ নেন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার পাবলিক পলিসি ম্যানেজার রুজান সারওয়ার, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান টেলিনর এশিয়ার হেড অব পাবলিক অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স প্রত্যুষ রাও, দেশী স্টার্টআপ শেয়ারট্রিপের প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া হক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান বিটিআরসির কমিশনার মাহমুদ হোসাইন। 

এই অধিবেশনে মেটার রুজান সারওয়ার বলেন, “উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন নিয়ে আমরা চার বছর ধরে লড়েছি। ডেটা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণের বিধানসহ কয়েকটি ধারার কারণে, আদৌ বাংলাদেশে মেটার উপস্থিতি রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে ভেবেছি। তবে সংসদে যে উপাত্ত সুরক্ষা আইন পাস হয়েছে, সেটি মেটা ও গুগলের মতো প্লাটফর্মগুলোর জন্য ভালো।” সম্প্রতি ফেসবুকে উসকানি দিয়ে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে হামলা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এখনও প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের অনেক জায়গায় আরও উন্নতি করতে হবে। তবে উসকানি যখন এক প্লাটফর্ম থেকে অন্য প্লাটফর্মে যায়, তখন কিছু করার থাকে না। ভবিষ্যতে স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে মেটার যোগাযোগ আরও বাড়ানো হবে।” 

টেলিনর এশিয়ার প্রত্যুষ রাও বলেন, “টেলিযোগাযোগ সংশোধন আইন আমরা অনেক দিন ধরেই নজর রাখছি। আমাদের জন্য এই আইনের ৯৭ (ক) ধারাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন এনটিএমসি বাদ দিয়ে নতুন সংস্থা হয়েছে। আমরা দেখতে চাই এই ম্যান্ডেট কীভাবে কাজ করবে, কে নির্দেশ দিবে এবং কার কর্তৃত্ব থাকবে।”  

বিটিআরসির কমিশনার মাহমুদ হোসাইন বলেন, “অনেক সময় বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কারণে আইন বদলে যায়। কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী যেভাবে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছাতে পারে, অন্যরা তেমনটা পারেন না। এতে আস্থার অভাব তৈরি হয়। তবে বিটিআরসি সবার সঙ্গে কথা বলেই নীতি প্রণয়নের চেষ্টা করে।” 

শেয়ারট্রিপের সাদিয়া হক বলেন, “নীতি আলোচনায় স্থানীয় উদ্যোক্তারা তেমন ভূমিকা রাখার সুযোগ পান না। একদিকে আইনের প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট জানা-শোনার ঘাটতি, অপরদিকে সরকারের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যায় না। এতে করে ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কণ্ঠ হারিয়ে যায়।” 

ডিনেটের আয়োজনে তৃতীয় প্যানেল আলোচনায় প্রতিষ্ঠানটি নির্বাহী চেয়ার ড. অনন্য রায়হান এবং অন্য বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন। এসময় এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) নীতিমালা প্রণয়নে অর্থবহ আলোচনার তাগিদ দেন। অনুষ্ঠানের শেষ অধিবেশনে ডিজিটালি রাইটের নবীন টেক পলিসি ফেলোরা তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ও মতামত তুলে ধরেন। 

আয়োজনের সমাপনী অনুষ্ঠানে ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এককভাবে সরকার বা বেসরকারি কোম্পানির বিষয় নয়। এতে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সব অংশীজনদের মতের প্রতিফলন থাকতে হবে।” তিনি জানান, এই সম্মেলন সেই আলোচনাকে চালিয়ে যাওয়ার একটি ক্ষেত্র এবং এটি তারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখবেন। 

/এসএনকে/এসটি/ 
সম্পর্কিত
ডেটা ফাঁস: ডিজিটাল নিরাপত্তার অদৃশ্য সংকট ও আমাদের দায়বদ্ধতা
‘ডিজিটাল সিকিউরিটির নামে কোনও সাংবাদিককে জেলে পাঠানো হবে না’
নঈম নিজামসহ ৩ সাংবাদিকের মামলা বাতিলের নির্দেশ
সর্বশেষ খবর
জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে না, বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর: গোলাম পরওয়ার
জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে না, বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর: গোলাম পরওয়ার
রংপুরের রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের উচ্ছ্বাস
রংপুরের রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের উচ্ছ্বাস
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির