প্রস্তাবিত জুয়া ও বেটিং আইন পুনর্বিবেচনার আহ্বান

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১০ জুন ২০২৬, ১৭:২৪ আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ১৭:২৬

দেশে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া ও বেটিং সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে সরকারের বিশেষ আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) নীতিগতভাবে স্বাগত জানিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এইচআরএফবি মনে করে, অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রণীত কোনও আইন এমন হওয়া উচিত নয়; যা ভবিষ্যতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং বিচারিক সুরক্ষাকে সংকীর্ণ করার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। 

বুধবার (১০ জুন) এক বিবৃতিতে একথা জানায় এইচআরএফবি।

এতে বলা হয়, বেটিং এবং জুয়া প্রতিরোধ আইন (অনলাইন ও অফলাইন), ২০২৬ এর খসড়া পর্যালোচনায় এইচআরএফবি লক্ষ্য করছে, প্রস্তাবিত ৩৯(১) ও ৩৯(২) ধারায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কেবলমাত্র ‘বিশ্বাস’ বা ‘সন্দেহের’ ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তির ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ, তল্লাশি, তথ্য সংগ্রহ, জব্দ এবং গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহির পর্যাপ্ত সুরক্ষা অনুপস্থিত থাকায়, নজরদারীভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের আশঙ্কা তৈরি করে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৯ ও ৪৩ অনুচ্ছেদ নাগরিকের সমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, গ্রেফতার-সংক্রান্ত অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ফলে কোনও ব্যক্তির ডিজিটাল ডিভাইস বা ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশের ক্ষমতা অবশ্যই সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া আবশ্যক।

এইচআরএফবি আরও লক্ষ্য করছে, খসড়া আইনের ৩৪ ধারায় অভিযোগ দায়ের, তদন্ত ও বিচার সংক্রান্ত বিধানে এবং ৩৯ ধারায় প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতার-সংক্রান্ত ধারাগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে পরিচিত ডিজিএফআইকে অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিশেষত ‘ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন’ ধরনের বিধানের মাধ্যমে বিশেষ ক্ষমতা প্রদানের উদ্যোগ গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। অতীতে এসব সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, জনপরিসরে বিস্তৃত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যথাযথ বিচারিক তদারকি ও জবাবদিহি ছাড়া অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।

খসড়া আইনটিতে উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো, খসড়া আইনের ৩৬ ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালতকে যে ধরনের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব দেখা যাচ্ছে, তা যথাযথ পর্যালোচনার দাবি রাখে। ভ্রাম্যমাণ আদালত দ্রুত প্রতিকার প্রদানের একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা হলেও এটি পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। ফলে এমন কোনও বিধান রাখা সমীচীন হবে না, যা বিচারিক সুরক্ষা দুর্বল করে বা অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য শুনানির অধিকারকে সীমিত করে। অতীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ ও সীমা নিয়ে আদালত, আইনজ্ঞ ও নাগরিক সমাজে আলোচনা ও বিচারিক পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাই নতুন কোনও আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে এমন ক্ষমতা দেওয়া সমীচীন হবে না, যা বিচারিক পর্যালোচনা ছাড়াই নাগরিকের স্বাধীনতা সীমিত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এইচআরএফবি মনে করে, জুয়া ও বেটিং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনটি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু আইনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এমন কোনও ধারা প্রণয়ন করা উচিত নয়; যা ব্যাপক নজরদারি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। অপরাধ দমন ও মানবাধিকার সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিচারিক তদারকির মাধ্যমেই উভয় লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।

এইচআরএফবি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, খসড়া আইনটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের আগে উদ্বেগজনক ধারাগুলো পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে সংশোধন বা প্রয়োজনে বাতিল করা হোক। তার পাশাপাশি, আইনবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে আইনটিকে সংবিধান, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানাচ্ছে এইচআরএফবি।

বিবৃতিতে সই করেছেন– এইচআরএফবির এক্সপার্ট ড. হামিদা হোসেন; অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল; রাজা দেবাশীষ রায়; আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না; নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান; এইচআরএফবির স্টিয়ারিং কমিটি সদস্য শাহীন আনাম; জাকির হোসেন; সারা হোসেন; রঞ্জন কর্মকার; সালেহ আহমেদ; সঞ্জীব দ্রং; টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান; এইচআরএফবির সদস্য ডা. ফওজিয়া মোসলেম; শামসুল হুদা; খুশী কবির; সরদার জাহাঙ্গীর হোসেন; শিপন কুমার রবিদাস; সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ; দেওয়ান জামান, নির্বাহী পরিচালক; পল্লব চাকমা; রোকেয়া রফিক বেবী; গীতা দাস; আবদুস সাত্তার দুলাল এবং আশরাফুন্নাহার মিষ্টি।

/এসও/আরকে/
সম্পর্কিত
রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির ব্যবহারে উদ্বেগ জানিয়ে ৩৮ নাগরিকের বিবৃতি
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ নয়: শোরুমে হামলার প্রতিবাদ ইউপিএলের
স্টুডিও ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার তদন্ত-বিচার দাবি গণসংহতির
সর্বশেষ খবর
রাত জেগে চোখে ক্লান্তির ছাপ? কতটা কার্যকর আই প্যাচ
রাত জেগে চোখে ক্লান্তির ছাপ? কতটা কার্যকর আই প্যাচ
পদত্যাগের ‘চূড়ান্ত ঘোষণা’ দিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন ইশরাক
পদত্যাগের ‘চূড়ান্ত ঘোষণা’ দিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন ইশরাক
বোমা হামলার হুমকিতে বুলগেরিয়ায় জরুরি অবতরণ করলো ইসরায়েলি ফ্লাইট
বোমা হামলার হুমকিতে বুলগেরিয়ায় জরুরি অবতরণ করলো ইসরায়েলি ফ্লাইট
খাঁটি ছানার পেড়া সন্দেশের বিশ্বজয়ের গল্প
খাঁটি ছানার পেড়া সন্দেশের বিশ্বজয়ের গল্প
সর্বাধিক পঠিত
সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু, কী ঘটেছিল জানালেন বাবা-মা
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে 
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে 
সেনা সদস্যদের জীবনমান আরও উন্নত করতে ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন
সাভার ক্যান্টনমেন্টে প্রধানমন্ত্রী  সেনা সদস্যদের জীবনমান আরও উন্নত করতে ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
‘আমি সাধারণ বিদেশি নই’: দেশ ছাড়ার নোটিশকে চ্যালেঞ্জ নায়ক ইমরান খানের
‘আমি সাধারণ বিদেশি নই’: দেশ ছাড়ার নোটিশকে চ্যালেঞ্জ নায়ক ইমরান খানের