দেশের অসংখ্য বাসা-বাড়িতে গৃহস্থালী কাজে সহায়তার জন্য গৃহকর্মী নিয়োগ করা হয়। কিন্তু এসব গৃহকর্মীর বড় একটি অংশই শিশু। আইন ও নীতিমালায় শিশুদের শ্রমে নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা হলেও বাস্তবে দিন দিন বাড়ছে শিশু গৃহকর্মী নিয়োগের প্রবণতা। একইসঙ্গে বাড়ছে তাদের ওপর নির্যাতন, সহিংসতা এবং মৃত্যুর ঘটনাও। ফলে অন্যের সংসার সামলাতে গিয়ে অনেক শিশুই নিজেই হয়ে পড়ছে অসহায় ও নিরাপত্তাহীন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক পরিবার তাদের শিশু সন্তানদের, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের, গৃহকর্মী হিসেবে বিভিন্ন বাসায় কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়। এতে পরিবার কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও প্রায়ই শারীরিক, মানসিক এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার হয় শিশুরা। অধিকাংশ ঘটনাই চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে। কেবল গুরুতর নির্যাতন বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেই তা জনসমক্ষে আসে।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত চার জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন এবং আট জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত অন্তত দুই জন শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
শিশু গৃহকর্মীদের পরিস্থিতি নিয়ে অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি) পরিচালিত ‘সিচুয়েশন অব চাইল্ড ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক জরিপে আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীতে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশ কোনও না কোনও ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় এবং ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত কাজের চাপে থাকে।
জরিপে দেখা গেছে, নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ শারীরিক আঘাতের শিকার হয়েছে, ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ মারধরের শিকার, ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ নিয়মিত বকাঝকা ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা
গত ৬ জুন চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে এক কলেজ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১০ বছর বয়সী এতিম শিশু মরিয়মকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, জীবননগর সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক লাবনী আক্তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দুই বছর আগে শিশুটিকে নিজের বাসায় নিয়ে যান। পরে তাকে দিয়ে ঘরের বিভিন্ন কাজ করানো হতো এবং সামান্য ভুলত্রুটিতেও মারধর করা হতো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মরিয়মকে ঘর পরিষ্কার, রান্না ও কাপড় ধোয়াসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হতো। লাঠি, রড ও গরম খুন্তি দিয়ে নির্যাতনের কারণে তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গত ৬ জুন মারধরের একপর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে সুযোগ পেয়ে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেয় এবং সেখান থেকে তার নানি তাকে উদ্ধার করেন।
এর আগে ১৯ মে রাজধানীর মিরপুরে ১০ বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মী মাইমুনা নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অ্যাডভোকেট মেহনাজ অনন্যা ও আইটি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবরার ফাইয়াজকে আটক করে পুলিশ।
মাইমুনার পরিবারের দাবি, প্রায় আড়াই বছর ধরে ওই দম্পতির বাসায় কাজ করছিল সে। এ সময় তাকে নিয়মিত নির্যাতন ও অনাহারে রাখা হতো। ঘটনার দিন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মাইমুনার মা বিউটি আক্তার বলেন, আড়াই বছর আগে অন্য এক নারীর মাধ্যমে মেয়েকে কাজে দিয়েছিলেন। এরপর বহু চেষ্টা করেও মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। এমনকি নিয়োগদাতারা তাদের বাসার ঠিকানাও জানাননি। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের নির্যাতনই তার মেয়ের মৃত্যুর কারণ।
গত ৩০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক দম্পতির বিরুদ্ধে ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে কে এম আবদুল্লাহ আল নোমান ও কিমিয়া সাদাত তোফাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
একই ধরনের আরেক ঘটনায় গত ২ ফেব্রুয়ারি ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার হন বাংলাদেশ বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বিথী।
প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যু ও আলোচিত প্রশ্ন
২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হকের বাসার ৯ তলা থেকে পড়ে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী গৃহকর্মী প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যু দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার একটি চা-বাগান এলাকার বাসিন্দা প্রীতিকে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে দুই বছর আগে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজে পাঠানো হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর গৃহকর্তা ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয় এবং রিমান্ডেও নেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘটনাটি অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।
প্রীতির মৃত্যুর ছয় মাস আগে একই বাসা থেকে পালাতে গিয়ে আহত হয় ফেরদৌসী নামে ৯ বছরের আরেক শিশু গৃহকর্মী। সেই ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দেয়, বাসাটিতে শিশু গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত ছিল।
যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিও রয়েছে
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, শিশু গৃহকর্মীরা শুধু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নয়, যৌন সহিংসতারও ঝুঁকিতে থাকে।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বরিশালে এক শিশুকে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়ার পর তাকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কেন বাড়ছে শিশু গৃহকর্মী?
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি। অধিকাংশ ঘটনাই জনসমক্ষে আসে না। সাধারণত হত্যাকাণ্ড বা গুরুতর নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটলেই বিষয়টি প্রকাশ পায়।
তার মতে, দেশের অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিশু সন্তানদের শহরে গৃহকর্মীর কাজে পাঠায়। কিছু পরিবার মানবিক আচরণ করলেও অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণ করা হয়। এমনকি শিক্ষিত পরিবারগুলোর মধ্যেও এ প্রবণতা দেখা যায়।
তিনি বলেন, গৃহকর্মীদেরও মৌলিক মানবাধিকার রয়েছে। তাদের নিরাপদ পরিবেশ, পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রাম ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিশু শ্রম ও নির্যাতনবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
আইন আছে, প্রয়োগে ঘাটতি
শিশু অধিকারকর্মী ও ‘শিশুরাই সব’ সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, শিশু গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং জবাবদিহি। বিশেষ করে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তারা ঘরের ভেতরে কাজ করে এবং তাদের দুর্ভোগ অধিকাংশ সময়ই অদৃশ্য থেকে যায়।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ৪৩টি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইন অনুযায়ী এসব খাতে শিশুদের কাজ করার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে এখনও বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
তিনি বলেন, গৃহশ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। একইসঙ্গে শিশু শ্রমের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ভাঙতে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কারণ অন্যের সংসার সামলাতে গিয়ে কোনও শিশুর শৈশব, নিরাপত্তা ও জীবনের অধিকার হারিয়ে যেতে পারে না। শিশুদের স্থান কর্মক্ষেত্রে নয়, বিদ্যালয়ে এবং নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশে, এই উপলব্ধিই হতে পারে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধের প্রথম পদক্ষেপ।









