হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চট্টগ্রামগামী একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট উড্ডয়নের প্রস্তুতির সময় এক যাত্রীর ব্যক্তিগত কারণে বিমান টার্মিনালে ফিরিয়ে আনার অভিযোগে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে শেরওয়ানি বাসায় ফেলে আসায় তিনি ফ্লাইট থেকে নামতে চান। এ ঘটনায় প্রায় ১০০ যাত্রীকে দীর্ঘ সময় ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
যা ঘটেছিল
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এয়ার অ্যাস্ট্রার একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। বোর্ডিং শেষে বিমানটি ট্যাক্সিওয়ে দিয়ে রানওয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এক যাত্রী বিমান থামিয়ে নামার অনুরোধ জানান।
অভিযোগ অনুযায়ী, কেবিন ক্রু তাকে জানান, জরুরি চিকিৎসা, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি বা যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া ট্যাক্সিওয়ে থেকে বিমান ফিরিয়ে আনার নিয়ম নেই। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নিজেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার হিসেবে পরিচয় দেন এবং পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে চাপ সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে তিনি ককপিটেও যান।
পরে বিমানটি ট্যাক্সিওয়ে থেকেই ঘুরিয়ে আবার টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই যাত্রীর নাম গোলাম রাব্বি প্রিন্স। তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার। পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে চট্টগ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাড়াহুড়োয় শেরওয়ানি বাসায় ফেলে আসেন। সেটি আনতেই তিনি বিমান থেকে নামার সিদ্ধান্ত নেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা বিলম্বের পর পুনরায় ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এ সময় শিশু, বৃদ্ধসহ প্রায় ১০০ যাত্রী দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। যাত্রীদের অভিযোগ, অপেক্ষার সময় তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থাও করা হয়নি।
‘নজিরবিহীন’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, নিরাপত্তার হুমকি, যান্ত্রিক ত্রুটি বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের নির্দেশ ছাড়া বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ট্যাক্সিওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। কোনো যাত্রীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এমন সিদ্ধান্ত অপারেশনাল নীতিমালা, নিরাপত্তা প্রটোকল ও পেশাগত নৈতিকতা—সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তোলে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ খায়রুল আলম ভুইয়া বলেন, এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে নামানোর পাশাপাশি তার লাগেজও পুনরায় নিরাপত্তা যাচাইয়ের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি।
এয়ার অ্যাস্ট্রার ব্যাখ্যা
এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ বিষয়টিকে একটি ‘কাকতালীয় ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করেছেন।
তার ভাষ্য, ওই যাত্রী যখন নামার জন্য জোরাজুরি করছিলেন, ঠিক তখনই বিমানের এয়ার কন্ডিশনিং (এসি) সিস্টেমে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং কেবিনের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে পাইলট বিমানটি টার্মিনালে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন এবং নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারকেও যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি জানান।
তার দাবি, পাইলটের এই 'অসম্পূর্ণ' ঘোষণার কারণেই ঘটনাটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
তদন্তের নির্দেশ
ঘটনার পর ভুক্তভোগী যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজনের ব্যক্তিগত কারণে পুরো বিমানের যাত্রীদের এমন ভোগান্তি মেনে নেওয়া যায় না। অনেকেই ক্ষতিপূরণের দাবিও জানিয়েছেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, যাত্রীদের কিছুটা দুর্ভোগ হয়েছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, ‘এটি খুবই গুরুতর ঘটনা। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ঘটনায় এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং সংশ্লিষ্ট বিমানের পাইলট, উভয়কেই তদন্তের আওতায় আনা হবে।’
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রী হয়রানির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।







