দুদিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে সোমবারও (১৩ জুলাই) চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরীর বাসিন্দারা। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি তলিয়ে যাওয়ায় পথযাত্রী, অফিসগামী যাত্রী, সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, রবিবার রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে রাজধানীতে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক এলাকা থেকে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি। ফলে জলজট থেকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিন রাজধানীর বংশাল, তাঁতি বাজার, গ্রিন রোড, পান্থপথ, তেজতুরী বাজার, মণিপুর, ধানমন্ডি ৩২ ও ২৭ নম্বর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কালশী, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইখালসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় হাঁটু সমান পানি থাকায় মানুষের চলাফেরায় ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও যানচলাচল ধীর হয়ে পড়েছে।
এদিকে সকালের বৃষ্টিতে ফের বনানী, কাকলী, মিরপুর, ইসিবি এবং কুড়িল এলাকার বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় নগরবাসীকে ওই সব রুট বাদ দিয়ে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপির গুলশান ট্রাফিক বিভাগ। গুলশান ট্রাফিক বিভাগ জানায়, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাতের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে।
ফলে বনানী কবরস্থানের ঢাকা গেট সংলগ্ন মূল সড়কের ইনকামিং এবং আউটগোয়িং উভয় দিকেই কিছুটা জলাবদ্ধতা রয়েছে। যান চলাচল কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। বনানী/কাকলী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামার র্যাম্পের প্রান্তে হালকা পানি জমেছে। যান চলাচল কিছুটা ধীর।
ইসিবি এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট গার্লস স্কুলের সামনে পানি জমে রয়েছে। ফলে মিরপুর ডিওএইচএস এবং কালশি থেকে ইসিবি হয়ে মাটিকাটা ফ্লাইওভারগামী যানবাহন ধীর গতিতে চলাচল করতে পারছে। যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়কে বৃষ্টির পানি জমার কারণে এবং ঢাকা ওয়াসার পাইপ লাইনিং কাজের জন্য যান চলাচলে ধীর গতি রয়েছে।
মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ নাসিম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওই এলাকার অনেক জায়গায় হাঁটু পর্যন্ত পানি। পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় তারা বাসায় বন্দি হয়ে পড়েছেন। গতকাল থেকে এই অবস্থা বিদ্যমান। সেই এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের লোকজনেরও দেখা মিললেও আদতে দুদিনেও জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হয়নি।
জলাবদ্ধতার কারণে বাসা থেকে বের না হতে পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বংশালের বাসিন্দা সাত্তার মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই সব সময় বংশাল এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অথচ কত দুদিন ধরে টানা বৃষ্টিপাত হয়েছে। যার কারণে এই এলাকার অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। ড্রেনের ময়লা আবর্জনা সব বাসার ভেতরে ঢুকে গেছে। কীভাবে কখন এই পানি নামবে সেই চিন্তায় আছি। সিটি করপোরেশনে ফোন দিয়ে এই এলাকার সমস্যার কথা জানিয়েছি, বললো কাজ চলমান। কবে যে এই কাজ শেষ হবে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন।
তিনি আরও বলেন, এই এলাকায় যেহেতু অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, শুষ্ক মৌসুমে এর সমাধান বের করা উচিত ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কেউ তা নিয়ে চিন্তা করেনি। আগে মেয়র মাঝেমধ্যে মানুষের খোঁজ-খবর নিতো। এখন কোনও জনপ্রতিনিধি নেই, কার কাছে গিয়ে দুঃখের কথা বলবো।
এদিকে শহরজুড়ে জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভাড়াও বেড়েছে দ্বিগুণ। মানুষের চলাচলে ভোগান্তি বেড়েছে বহুগুণ। অনেক জায়গায় চলন্ত বড় যানবাহনের কারণে সৃষ্ট ঢেউয়ে পথচারীরা ভিজে যাচ্ছে।
বংশাল থেকে ধানমন্ডি পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মাকে ডাক্তার দেখাতে নেওয়ার জন্য রাস্তায় যানবাহনের অপেক্ষায় ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরাফাত রহমান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনও যানবাহন না পাওয়ায় অটোরিকশার দ্বারস্থ হন তিনি। বাংলা ট্রিবিউনকে আরাফাত বলেন, বিকালে ৫টায় ডাক্তার দেখানোর সিরিয়াল দিলাম। মা অসুস্থ এ জন্য বাসে যাতায়াত অসম্ভব। বংশাল থেকে ধানমন্ডি পপুলার সর্বোচ্চ ১০০ টাকার ভাড়া অটোরিকশা চালক ৪০০ টাকা চাচ্ছে। কারণ এখান থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত সড়ক ডুবে গেছে। উপায় না পেয়ে ৩৫০ টাকা ভাড়ায় রওনা দিলাম।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে আপ্রাণ চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ডিএসসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, গতকাল থেকেই আমাদের কর্মীরা জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠে আছে। টানা বৃষ্টির কারণে এই সমস্যাটা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা কল পেয়েছি, আমাদের টিম সেখানে যাচ্ছে এবং সেখানকার সমস্যা সমাধানের কাজ করছে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, আকস্মিক অতিভারী বৃষ্টির পাশাপাশি খাল ও ড্রেন সংকুচিত হওয়া, অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা এবং পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসির কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।









