আদালতে মামলার জট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে আইনি সহায়তা ও মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনাকারী বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এডিআর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা গেলে আদালতে নতুন মামলা দায়েরের প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ও কার্যকর আইনি সেবা পাবেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের সঙ্গে ব্লাস্ট ও ব্র্যাকের পৃথক সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে আইনগত সহায়তা কার্যক্রম ১৯৯৪ সালে প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে শুরু হয়। ২০০০ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পরে আইনটিকে সময়োপযোগী করতে বিভিন্ন সংশোধন আনা হয়েছে। বর্তমান সরকার আইনগত সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও জনমুখী করতে কাজ করছে।”
তিনি বলেন, “সরকারের একার পক্ষে মামলার জট নিরসন করা সম্ভব নয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এবং মধ্যস্থতায় দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে হবে। ব্লাস্ট ও ব্র্যাকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সেই যৌথ উদ্যোগের অংশ।”
২০ জেলায় মামলা কমেছে ৬২ শতাংশ
আইনমন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের ২০টি জেলায় নির্দিষ্ট কয়েকটি আইনের আওতায় ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে মাসে নতুন মামলা দায়েরের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ শতাংশের বেশি কমেছে।
এটিকে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।”
বিচারাধীন উপযুক্ত মামলাগুলোও মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, এডিআর প্রক্রিয়াকে আরও উৎসাহিত করা গেলে আদালতের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার আনতেও সরকার প্রস্তুত।
জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রমের সঙ্গে বেসরকারি অংশীদারদের যুক্ত করা হবে জানিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এর মাধ্যমে বিচারাধীন মামলাও মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি হবে। মামলার জট কমাতে কার্যকর গবেষণা বা আইন সংস্কারের বাস্তবসম্মত যেকোনও প্রস্তাব সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের চিন্তা
সম্পত্তি-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা কমাতে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি আইন সংশোধনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত সংশোধনের মাধ্যমে বাবা-মা জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও সেই সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ এবং অপ্রয়োজনীয় মামলা কমতে পারে।”
আইনমন্ত্রী বলেন, “আইনগত সহায়তা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যেই সরকারি লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এই কাজে গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।”
তিন জেলায় কোর্ট প্যারালিগ্যাল
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ব্লাস্টের সহযোগিতায় ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে কোর্ট প্যারালিগ্যাল নিয়োগ করা হবে। তাদের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে ব্লাস্টের মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন মধ্যস্থতাকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হবে। মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যাতে আদালতে মামলা করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অপরদিকে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় পেশাদার মধ্যস্থতাকারীদের প্রশিক্ষণ ও সনদ দেওয়া হবে। সফল মধ্যস্থতাকে আইনগত স্বীকৃতি, ব্যর্থ মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন প্রদান এবং যৌথভাবে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের আশা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই হবে।
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম এরশাদুল আলম ও মো. খাদেম উল কায়েস, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসাইন, ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনগত সুরক্ষা কর্মসূচি এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব ও ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া আইন ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

ক্রিকেটার থেকে যেভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আতঙ্ক, সেকেন্ড ইন কমান্ড







