ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে ইতালিতে অনিয়মিতভাবে প্রবেশের চেষ্টায় গত বছরের মতো এবারও বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে এবার নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে গ্রিসগামী বাংলাদেশিদের সংখ্যাও। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো সাগরপথে গ্রিসে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ শীর্ষে উঠে এসেছে।
বুধবার (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’। দিবসটি সামনে রেখে ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্স, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ব্র্যাকের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বাংলাদেশিদের অনিয়মিত অভিবাসনের উদ্বেগজনক চিত্র।
ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি এভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।
সংস্থাটির মতে, গত কয়েক বছর ধরেই ইতালিতে অনিয়মিত প্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এবার গ্রিসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সাগরে মৃত্যুযাত্রা, লিবিয়ায় নির্যাতন
সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকির সাম্প্রতিক উদাহরণ এ বছরের মার্চের ঘটনা। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
জানা যায়, ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা মাঝসাগরে দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় ভাসতে থাকে। একপর্যায়ে সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের মৃত্যু হয়। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
এমন মৃত্যুঝুঁকির পরও এই যাত্রা থামছে না। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি থেকে অসংখ্য বাংলাদেশি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
কারা যাচ্ছেন
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, এভাবে ইউরোপে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের অন্তত ১০ থেকে ১২টি জেলার মানুষ এভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য ঝুঁকি নিচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপকে এখন এই মানবপাচার চক্রের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশে ফিরে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করলেও মূল হোতারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মানবপাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। পুলিশ ও সিআইডি এসব মামলার তদন্ত করছে।
নতুন ফাঁদ সাইবার স্ক্যাম
অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের পাশাপাশি নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে সাইবার স্ক্যাম।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নেওয়া ৯৮ শতাংশ বাংলাদেশি কোনো চাকরি পাননি। বরং তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ৯০ শতাংশকে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতিমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ রাজি না হলে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
ফেসবুকে ‘গেম’-এর প্রলোভন
ফেসবুক এখন লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ইতালি যাওয়ার অন্যতম বড় ফাঁদ। মানবপাচারকারী চক্র এটিকে ‘গেম’ নামে প্রচার করে।
বিভিন্ন ভিডিওতে ইতালি বা গ্রিসের সমুদ্রসৈকতে পৌঁছানো, ইতালির রাস্তায় হাঁটা কিংবা সুপারমার্কেটে কেনাকাটার দৃশ্য দেখিয়ে ক্যাপশন দেওয়া হয়— ‘আলহামদুলিল্লাহ, আজ ৭ দিনে গেম ডান’, ‘আরেক ভাইয়ের গেম ক্লিয়ার’। কিন্তু লিবিয়ার বন্দি ক্যাম্পে নির্যাতনের দৃশ্য কখনও দেখানো হয় না।
টিকটক ও ফেসবুক রিলসে বিভিন্ন ‘প্যাকেজ’ ঘোষণা করা হয়। যেমন— ‘ইতালি ফুল প্যাকেজ ১৪ লাখ, লিবিয়া থেকে বোটে ইতালি’ কিংবা ‘গ্রিসের নতুন গেম চালু, ১০ দিনে পৌঁছানোর গ্যারান্টি’। ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের এসব ভিডিওতে ইতালির মনোরম দৃশ্য ও আরবি গান ব্যবহার করা হয়। মন্তব্যের ঘরেও ভুয়া আইডি থেকে ‘বিশ্বস্ত’ বলে প্রচারণা চালানো হয়।
অনেক মধ্যস্বত্বভোগী লিবিয়া থেকেই লাইভে এসে দাবি করেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, ফ্রন্টেক্সের জাহাজ উদ্ধার করে ইতালিতে নিয়ে যাবে।’ কিন্তু মাঝসমুদ্রে দিনের পর দিন খাদ্য ও পানির সংকট কিংবা নৌকাডুবির ঝুঁকির কথা তারা গোপন রাখেন।
কেউ আগ্রহ প্রকাশ করলেই তাকে মেসেঞ্জার বা ইমোতে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সেখানে লিবিয়ায় থাকা ভুক্তভোগীদের দিয়ে জোর করে বানানো ‘ভালো আছি’ ধরনের ভিডিও পাঠিয়ে আশ্বস্ত করা হয়। বলা হয়, ইতালি পৌঁছানোর আগে টাকা লাগবে না। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই শুরু হয় জিম্মি করে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা আদায়ের নির্যাতন।
পাচারকারীরা জেলা-ভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপও পরিচালনা করে। যেমন— ‘মাদারীপুর টু ইতালি’, ‘সিলেট টু ইউরোপ গেম নিউজ’। যেসব জেলা থেকে বেশি মানুষ ইউরোপে যেতে চান, সেই জেলার ভাষায় ভিডিও তৈরি করে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছে। এবার গ্রিসে যাওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রথম। এই পথে অনেকের প্রাণহানি ঘটছে। পাশাপাশি লিবিয়ার ক্যাম্পগুলোতে বাংলাদেশিদের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে এবং পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদেশে কাজ বা শ্রম অভিবাসনের নামে মানবপাচার এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাচারকারীরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করলেও সেই তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পিছিয়ে রয়েছে। আবার মানবপাচারের মামলাগুলোরও যথাযথ বিচার হচ্ছে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং পাচারের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচার ও অভিবাসনসংক্রান্ত প্রতারণা মোকাবিলায় আইন, প্রযুক্তি এবং আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে নতুন আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অপরাধী চক্রের পরিবর্তিত কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে বিশ্ব মানবপাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ‘ট্র্যাপড বিহাইন্ড দ্য স্ক্যাম: এন্ডিং হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ফর ফোর্সড ক্রিমিন্যালিটি’ শীর্ষক এ সংলাপে তিনি বলেন, ‘মানবপাচার চক্র ডিজিটাল প্রযুক্তিকে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই হুমকি মোকাবিলায় শুধু প্রথাগত আইনশৃঙ্খলা-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও সচেতন নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’









