দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম নতুন একটি গবেষণা ও নীতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ‘নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্ট’ নামে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বও পালন শুরু করেছেন তিনি।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে সিপিডির সঙ্গে যুক্ত এই গবেষকের নতুন উদ্যোগের পর প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি সিপিডি ছাড়তে যাচ্ছেন? সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, গত মাসে সিপিডি ছাড়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছেন ড. মোয়াজ্জেম। তবে সিপিডি থেকে তার আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি এখনও জানানো হয়নি।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম নিজেও জানিয়েছেন, তিনি এখনও পর্যন্ত সিপিডি থেকে পদত্যাগ করেননি। ফলে তার নতুন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে সিপিডির বর্তমান দায়িত্বের সম্পর্ক কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
নতুন প্রতিষ্ঠান ‘নলেজ হাব’
ইতোমধ্যে ড. মোয়াজ্জেমের নেতৃত্বে ‘নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্ট’ নামে নতুন গবেষণা ও নীতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে—নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা, গভীরতর তথ্য ও বিশ্লেষণ সরবরাহ, সামাজিক বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণা এবং কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ বিষয়ে কাজ করা।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও পরিচিতিমূলক তথ্য অনুযায়ী, ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকার বনানীতে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ঠিকানা এবং মোহাম্মদপুরে পরিচালনাগত কার্যালয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক নীতি, শিল্প, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শ্রম, তৈরি পোশাকশিল্প ও বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা অভিজ্ঞতা রয়েছে ড. মোয়াজ্জেমের। তার নতুন প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মূল ক্ষেত্রও এসব বিষয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
এখনও সিপিডিতেই আছেন
নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরও সিপিডির গবেষণা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মোয়াজ্জেম। সিপিডির সাম্প্রতিক বিভিন্ন কার্যক্রমেও তাঁকে গবেষণা পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
চলতি আগস্টে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তার নেতৃত্বেই সিপিডির পক্ষ থেকে বিভিন্ন নীতিগত প্রস্তাব ও গবেষণাভিত্তিক মতামত দেওয়া হয়েছে।
ড. মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, তিনি এখনও সিপিডি থেকে পদত্যাগ করেননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত মাসে তিনি সিপিডি ছাড়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও তার দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি এখনও সম্পন্ন হয়নি।
এ কারণে ড. মোয়াজ্জেম সিপিডির দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গভাবে দাঁড় করাচ্ছেন কি না, নাকি সিপিডির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই নতুন গবেষণা উদ্যোগ পরিচালনা করবেন; তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সিপিডিতে নেতৃত্বেও পরিবর্তন
ড. মোয়াজ্জেমের সম্ভাব্য প্রস্থানের আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন সিপিডির নির্বাহী নেতৃত্বেও পরিবর্তন হচ্ছে। দীর্ঘ সাড়ে ৯ বছর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ড. ফাহমিদা খাতুন ওই পদ থেকে সরে যাচ্ছেন। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি সিপিডির সম্মানিত ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ পেয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি এর আগে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন।
একই সময়ে নির্বাহী নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং গবেষণা বিভাগের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তার সম্ভাব্য প্রস্থান সিপিডির গবেষণা কাঠামো ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
আরও কয়েকজন গবেষক কি ড. মোয়াজ্জেমের প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন?
ড. মোয়াজ্জেমের নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিপিডির আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও গবেষক যুক্ত হতে পারেন; এমন আলোচনা সংশ্লিষ্ট মহলে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, অভিজ্ঞ গবেষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শেষ পর্যন্ত নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলে বাংলাদেশের নীতিগবেষণা অঙ্গনে নতুন একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তবে এখনই সিপিডির গবেষক বা কর্মকর্তাদের একটি অংশ নতুন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই।
দুই দশকের বেশি সময় সিপিডিতে
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সিপিডির গবেষণা পরিচালক হিসেবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময়ে বাংলাদেশের শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, শ্রমবাজার, তৈরি পোশাকশিল্প এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সিপিডির বহু গবেষণা ও নীতিগত উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
দেশের অর্থনৈতিক নীতি, বাজেট-পরবর্তী বিশ্লেষণ, শিল্পখাতের সংকট, শ্রমিকদের অধিকার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রফতানি খাতের বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি নিয়মিত মতামত দিয়ে আসছেন।
ফলে তার সম্ভাব্য প্রস্থান শুধু একজন গবেষকের চাকরি পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি সিপিডির গবেষণা সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
তাহলে কি সিপিডি ছেড়ে দিচ্ছেন?
এই মুহূর্তে ড. মোয়াজ্জেম সিপিডি ছেড়ে দিচ্ছেন, এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। তিনি নিজেও জানিয়েছেন, এখনও পদত্যাগ করেননি। একই সঙ্গে সিপিডির গবেষণা পরিচালক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তবে নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সিপিডি ছাড়ার বিষয়ে নোটিশ দেওয়ার আলোচনা এবং সিপিডির নির্বাহী নেতৃত্বে পরিবর্তন; সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আগামী দিনে ড. মোয়াজ্জেম সিপিডির দায়িত্বে থাকবেন, নাকি নতুন প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার জন্য সিপিডি ছাড়বেন; সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। একই সঙ্গে তার সঙ্গে সিপিডির আরও কোনো গবেষক বা কর্মকর্তা নতুন উদ্যোগে যুক্ত হন কি না, সেটিও পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করবে।








