বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি!’— স্লোগানে নতুন লোগোর জন্য আইডিয়া ও নকশা আহ্বান করেছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটি। তবে লোগো পরিবর্তনের খবর সামনে আসার পর পুরোনো লোগোর সঙ্গে শৈশবের স্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকার কথা তুলে ধরে এর পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন অনেক দর্শক। কেউ কেউ আবার পুরোনো লোগো রেখে সেটিকে আধুনিক করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিটিভির বর্তমান লোগোটির সঙ্গেও দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। জানা গেছে, সবুজ বেষ্টনীর মধ্যে উদীয়মান লাল সূর্যের প্রতীকসমৃদ্ধ লোগোটির নকশার সঙ্গে শিল্পী ইমদাদ হোসেন, কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার ও মহিউদ্দিন ফারুকের সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯৮০ সালে বিটিভি রঙিন সম্প্রচারে যাওয়ার সময় লোগোটির রঙিন রূপ ব্যবহারের তথ্যও বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফলে নতুন লোগোর উদ্যোগ ঘিরে মূল আলোচনাটি শুধু নকশা পরিবর্তন নিয়ে নয়। বিটিভিকে আধুনিক ও নতুন প্রজন্মের উপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে এর দীর্ঘদিনের পরিচিতি, ইতিহাস ও দর্শকের আবেগ কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে– সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
গত ৩০ আগস্ট বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে নতুন লোগো তৈরির জন্য প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ ও ডিজাইনারদের কাছ থেকে নতুন লোগোর আইডিয়া বা ডিজাইন আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে [email protected] ঠিকানায় নকশা পাঠাতে বলা হয়েছে।
বিটিভির এই উদ্যোগের পর ফেসবুক পোস্টটির মন্তব্যে নিজেদের মতামত জানাচ্ছেন দর্শকরা। তাদের বড় একটি অংশ পুরোনো লোগো পরিবর্তনের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, লোগোটি শুধু বিটিভির পরিচয়চিহ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের দর্শকের শৈশব, স্মৃতি ও আবেগ।
লিও ইয়াসিন আরাফাত নামে একজন মন্তব্য করেছেন, বিটিভির বর্তমান লোগো দেখলেই তার ছোটবেলার কথা ও পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে। লোগো পরিবর্তন হলে সেই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি পরিচিত প্রতীক হারিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। আবেগের জায়গা থেকে তাই বিটিভির লোগো পরিবর্তন না করার পক্ষে মত দিয়েছেন এই ব্যবহারকারী।
মো. রেদোয়ান রিয়াদ নামের আরেকজন পুরোনো লোগো রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, এই লোগোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শৈশবের শত স্মৃতি। অনিক হাসান হৃদয়ও আগের লোগোটিকেই ‘সেরা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে পরিবর্তনের বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। কয়েকজন দর্শক লোগো পুরোপুরি বাদ না দিয়ে আধুনিক করার পরামর্শ দিয়েছেন। শেখ ফরিদুল আহমেদ বর্তমান লোগো বহাল রেখে বিটিভি এইচডি চ্যানেলে কিছুটা থ্রিডি ট্রানজিশন স্টাইল আনার প্রস্তাব দিয়েছেন। একইসঙ্গে ছোটবেলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মাগরিবের আজানের সুন্দর সুরটি আবার চালুর অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি।
লোগো পরিবর্তনের আলোচনার পাশাপাশি বিটিভির কার্যক্রম ও নতুন চ্যানেল নিয়েও দর্শকদের প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে। মাহমুদ নামে একজন ব্যবহারকারী ‘বিটিভি স্পোর্টস’ নামে আলাদা একটি ক্রীড়া চ্যানেল চালুর দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ঘরোয়া ফুটবল ও ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা সম্প্রচারের জন্য এমন উদ্যোগ সময়োপযোগী হতে পারে।
বিটিভির লোগো পরিবর্তন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক উপমহাপরিচালক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ ম হারূন তিনি লিখেছেন, ‘হঠাৎ করে নিচের বিজ্ঞপ্তিটি আমার চোখে পড়লো। ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি। বিটিভির স্বর্ণালী সময়ের একটি আবেগ এখনো টিকে আছে, সেটি হলো বিটিভির লোগো। এই লোগোকে আরো আকর্ষণীয় করা যেতে পারে, কিন্তু সেটা হতে হবে ঐতিহাসিক ‘লোগো’টিকে টিকিয়ে রেখে।’
খ ম হারূন আরও লিখেছেন, ‘মনে রাখতে হবে বর্তমান লোগোটিতে শিল্পী কামরুল হাসান ও মুস্তাফা মনোয়ারের হাতের স্পর্শ আছে। শিল্পী ইমদাদ হোসেন ১৯৭১ এর ডিসেম্বরে বিটিভির লোগো নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে বিটিভি যখন রঙিন যুগে প্রবেশ করে তখন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আগের লোগোটিকে আবার নতুন রূপে অঙ্কিত করেন।’
এর আগে, গত ২৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন। সেই সাক্ষাতের ছবি নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘বিটিভি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বৃহৎ পরিকল্পনা’ রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী বিটিভিকে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য, আধুনিক ও জনআস্থার চ্যানেল’ হিসেবে দেখতে চান।
ওই পোস্টে কাজী জেসিন আরও লেখেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিটিভিকে ক্ষমতাসীন দল ও ‘ফ্যাসিবাদের প্রচারযন্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। অতীতেও প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে দর্শক হারিয়েছে এবং গণঅভ্যুত্থানের পরও পরিবর্তনের সূচনা হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কাজী জেসিনের ভাষ্য, গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকে ‘নয়া বন্দোবস্ত’ এর কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুখে সেই শব্দ ব্যবহার না করে নীরবে পরিবর্তনের কাজ করছেন। বিটিভি শুধু আগের অবস্থানে ফিরে যাবে না, বরং আরও ‘অনন্য, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ’ জায়গায় যাবে– প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা শুনে তিনি অভিভূত হয়েছেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন।
লোগো পরিবর্তনের বিষয়ে বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা বিটিভিকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করছি। অর্গানোগ্রাম, শিল্পী সম্মানী, সংবাদ পরিবেশনা থেকে শুরু করে সর্বস্তরে আধুনিকায়ন করতে চাই। এই আধুনিকায়নের পথে যে পরিবর্তনগুলো দরকার, তারই একটি অংশ হলো লোগো পরিবর্তন।’
স্মৃতিবিজরিত এই লোগো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করেই এই পরিবর্তন আনার কথা জানান। তিনি বলেন, আমাদের বরেণ্য শিল্পীদের অবদান সংরক্ষণ করতে চাই। মানুষ যদি না চায়, তাহলে লোগো পরিবর্তন হবে না। তবে যে পরিবর্তনই আনি না কেন, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করেই আনা হবে। পরিবর্তনগুলো আনা হবে শিল্পীসহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই।'

প্রধানমন্ত্রী বিটিভিকে বিশ্বাসযোগ্য ও আধুনিক চ্যানেল হিসেবে দেখতে চান: কাজী জেসিন






