আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ। তবে এ লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বর্তমানে দেশের রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর বর্তমান প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করতে হবে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘দ্য ন্যাশনাল কনসালটেশন অন স্কিলস, মাইগ্রেশন অ্যান্ড মোবিলিটি: দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় পরামর্শ সভায় এসব কথা বলেন তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে নেদারল্যান্ডসের র্যাডবাউড ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বাধীন ‘গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি ফর স্কিলস মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) এ সভার আয়োজন করে।
সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান ধারায় কাজ চললে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ দেশের রয়েছে। তাই বিদেশে কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা বাড়াতে আরও জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণ আছে, দক্ষতার স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) সদস্য (নিবন্ধন ও সনদায়ন) ও অতিরিক্ত সচিব মো. রবিউল ইসলাম বলেন, প্রায় সাত লাখ প্রশিক্ষণার্থী এনএসডিএর সনদ পেয়েছেন। তবে দেশের ভেতরেই এসব সনদের স্বীকৃতি সন্তোষজনক নয়।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘দেশে যদি সন্তোষজনক না হয়, তাহলে বিদেশে কেন তা সন্তোষজনক হবে?’
রবিউল ইসলাম জানান, এনএসডিএর সনদধারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ দেশে বা বিদেশে চাকরি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন বিদেশে কাজ করছেন। বর্তমানে এনএসডিএর নিবন্ধিত দক্ষতা প্রশিক্ষণদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৩০০। এসব প্রতিষ্ঠান ৩৬৯টি পেশায় প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
তবে ২২টি মন্ত্রণালয় ও ৩৬টি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে এনএসডিএতে কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র ১৮ জন।
প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে বড় অসামঞ্জস্য
ওকাপের গবেষণা ব্যবস্থাপক উর্মি জাহানের উপস্থাপিত গবেষণায় প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৭৪৫ জন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ১৮ লাখ তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৫ থেকে ৪৭ শতাংশ উপযুক্ত কাজ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ কর্মী আংশিক কর্মসংস্থান বা আন্ডারএমপ্লয়মেন্টের শিকার। দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই অনানুষ্ঠানিক খাতে।
উর্মি জাহান বলেন, শুধু কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, তা বিবেচনা করলেই হবে না। কী দক্ষতা দেওয়া হচ্ছে, সেই দক্ষতার চাহিদা কোথায় এবং কারা তা কাজে লাগাবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
গবেষণায় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে দুর্বল যোগাযোগ, ব্যবহারিক ও শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা, পুরনো পাঠ্যক্রম ও সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণ শেষে গ্র্যাজুয়েটদের অবস্থান সম্পর্কে দুর্বল তথ্যব্যবস্থাকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ও সবুজ প্রযুক্তির সঙ্গে প্রশিক্ষণের অপর্যাপ্ত সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানে দক্ষতার অসামঞ্জস্য
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রাহনুমা সালাম খান বলেন, দক্ষতার অসামঞ্জস্যকে আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণে বছরের পর বছর বিনিয়োগের পরও বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থানের ৭০ শতাংশের বেশি ঐতিহাসিকভাবে স্বল্পদক্ষ কাজের মধ্যেই রয়েছে। অভিবাসন ব্যয় বেশি হওয়ার সঙ্গেও দুর্বল ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক রয়েছে। কম শিক্ষিত ও কম সচেতন কর্মীরা সহজেই শোষণের শিকার হন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সাবেক পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ২০০৮ সালে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল এক শতাংশেরও কম। ২০২৫ সালে তা ২০ শতাংশের বেশি হয়েছে। তবে প্রশিক্ষণ এখনো শিল্প খাত ও গন্তব্য দেশের চাহিদার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, বিএমইটির ১১০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম প্রকৃত বাজারচাহিদার সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে যুক্ত নয়।
ঢাকা টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মো. সাকাওয়াত আলী বলেন, বাংলাদেশের আরও উন্নত শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা, শক্তিশালী ভাষা প্রশিক্ষণ এবং গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে এমন চুক্তি প্রয়োজন, যাতে বিদেশে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার সনদ স্বীকৃতি পায়।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনও দেশের শ্রমবাজারে অটোমোবাইল টেকনিশিয়ানের চাহিদা থাকলে বাংলাদেশ থেকে সেখানে নির্মাণ বা টাইলসের কাজের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী পাঠানো হলে দক্ষতার স্পষ্ট অসামঞ্জস্য তৈরি হবে।
ইতালির ভিসা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্চ খরচ
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালীয় দূতাবাসের অভিবাসন বিশেষজ্ঞ জিউসেপ্পে দি জিওভান্নি বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইতালি বাংলাদেশিদের ২০ হাজারের বেশি কাজের ভিসা দিয়েছে। একই সময়ে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে অনিয়মিত পথে ইতালিতে পৌঁছেছেন।
তিনি বলেন, ইতালির কাজের ভিসার সরকারি ফি মাত্র ৬৫ ইউরো। তবে বাংলাদেশি অভিবাসীরা মধ্যস্বত্বভোগীদের ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত দিয়ে থাকেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রথম সচিব লরা কার্তানিয়া লিয়াখ বলেন, ইইউ-বাংলাদেশ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের আওতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও তা এখনো কর্মসংস্থানের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিতভাবে যুক্ত হয়নি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সংস্কারে বাজেট সহায়তা হিসেবে ইইউ প্রায় ৮ কোটি ইউরো বিনিয়োগ করেছে।