সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও সাংবাদিক রাজীব ঘোষকে কর্মস্থল থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দুই সাংবাদিকের মুক্তি দাবি করছেন। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তাদের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি পুলিশ। দুজনকে গ্রেফতার করা হবে, নাকি জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হবে সেটা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে ডিবিসি নিউজের কার্যালয় থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ও সিনিয়র সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী এবং প্রতিষ্ঠানটির ক্রাইম চিফ রাজীব ঘোষকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ঘটনার পর থেকেই সাংবাদিকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশ না করে কর্মস্থল থেকে সাংবাদিকদের ডিবি হেফাজতে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সহকর্মীরা। একই সঙ্গে দুই সাংবাদিকের অবস্থান ও তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার দাবি উঠেছে।
এদিকে সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটকের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, যদি তিনি আটক হয়ে থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ থাকার কারণেই প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি আইন অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হবে।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আখতার হোসেন জানিয়েছেন, একটি সংবাদ প্রচারকে কেন্দ্র করে ডিবিসি কার্যালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রাজীব ঘোষকে নিরাপদে ডিবি কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তাদের এখনও আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ রোমিও। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘সরকারের কাছে সাংবাদিক রাজীব ঘোষকে সসম্মানে তার কর্মক্ষেত্রে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানাই।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনও সাংবাদিককে ডিবি হেফাজতে নেওয়া আতঙ্কজনক। সাংবাদিকতার ওপর নগ্ন হামলার বহিঃপ্রকাশ। আশা করছি সরকার আমার কথা শুনছেন।’
এদিকে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট। একই সঙ্গে তার দ্রুত মুক্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটির আহ্বায়ক আকতার হোসেন ও সদস্য সচিব শেখ জামাল বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে নিজ কার্যালয় থেকে আটক করার ঘটনা দুঃখজনক ও নজিরবিহীন। এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।’
তারা বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ধরনের ঘটনায় সাংবাদিক সমাজের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অবিলম্বে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মুক্তির দাবি জানান তারা।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি, দৈনিক অবজারভারের সম্পাদক ও ডিবিসি নিউজের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশের (এটিজেএফবি) বর্তমান সহসভাপতি ও ডিবিসি নিউজের বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব ঘোষকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি তানজিম আনোয়ার ও সাধারণ সম্পাদক বাতেন বিপ্লব।
বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, কোনো ধরনের গ্রেফতারি পরোয়ানা বা আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়টি স্পষ্ট না করেই রাজীব ঘোষকে অফিস থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একজন পেশাদার সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নির্বাচিত নেতার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নাগরিক অধিকারের জন্য অশনিসংকেত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার থাকলেও তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হতে হবে। কাউকে আটক বা গ্রেফতারের ক্ষেত্রে তার পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের কাছে আইনগত ভিত্তি ও অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি। আইন প্রয়োগের নামে কোনো নাগরিকের আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন করার সুযোগ নেই।
তারা বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। একজন সাংবাদিককে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ভীতি ও উদ্বেগ সৃষ্টি করবে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীন পরিবেশের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বিবৃতিতে অবিলম্বে রাজীব ঘোষের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তারা।
রাজীব ঘোষকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও (ডিআরইউ)। বুধবার (৪ নভেম্বর) এক বিবৃতিতে সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এ উদ্যোগ জানান।
ডিআরইউ বলছে, একজন সাংবাদিককে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেকোনো পদক্ষেপ অবশ্যই প্রচলিত আইন ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হতে হবে।
তারা আরও বলেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার সুরক্ষায় এ ধরনের ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডিআরইউ নেতারা অবিলম্বে রাজীব ঘোষের অবস্থান তার পরিবার ও সহকর্মীদের কাছে স্পষ্ট করা এবং আইনগত ভিত্তি না থাকলে তাকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।