দুই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রাজধানীর মিরপুরের তিনটি ওয়ার্ডের দেড় হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে গ্যাসবিল নিয়েছিল ওমর ফারুক। গ্যাসবিল ছাড়াও বিদ্যুৎ ও পানির বিল নিয়েছে ওমর ফারুকের এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’। গ্রাহকদের পানি ও বিদ্যুৎবিল সে জমা দিলেও দেড় বছরের গ্যাস বিল জমা না দিয়ে আত্মসাত করেছে। এসময় খোঁজও নেয়নি তিতাস কর্তৃপক্ষ। নীরবে ওমর ফারুক গ্রাহকদের ১০ কোটি টাকা আত্মসাত করে পালিয়ে যাওয়ার দেড় বছর পর তিতাস মাইকিং করে জানায় তারা বিল পায়নি।
ভুক্তভোগীদের ধারণা, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ওমরের সঙ্গে আঁতাত করে টাকা আত্মসাত করেছে। কারণ এর আগে বিল জমা না দিলে তিতাস গ্রাহকদের বিল চাইতো। কিন্তু ওমরের এজেন্ট ব্যাংকিং বিল জমা দেওয়ার দেড় বছরে বিল চায়নি তিতাস।
রবিবার (৬ জুন) মধ্যরাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে ওমরকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৪। সোমবার (৭ জুন) বিকেলে কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে র্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক সংবাদ সম্মেলনে ওমর ফারুককে গ্রেফতার করার বিষয়টি জানায়।
তিনি বলেন, ‘তিতাসের বিল আত্মসাতকারী ও জালিয়াতির মূলহোতা ফারুককে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৪। সে মিরপুরের ১৫শ’ গ্রাহকের টাকা আত্মসাত করেছে।’
২০১৮ সাল থেকে রাজধানীর মিরপুর-২ এর ৬০ ফিট এলাকায় ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’ নামে একটি এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে এবং এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকার প্রায় দেড় হাজার গ্রাহকের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের বিলের টাকা সংগ্রহ করতো। কিন্তু গত প্রায় ২ বছর ধরে ওমর ফারুক গ্রাহকের গ্যাস বিলের ১০ কোটি টাকা জমা না দিয়ে আত্মসাত করে। গত জানুয়ারিতে মিরপুর এলাকায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে বকেয়া বিলের জন্য প্রায় দেড় হাজার গ্রাহকের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রচারণা চালায়। মাইকিং’র পরপরই ভুক্তভোগী গ্রাহকরা
প্রতারক ফারুকের ও তার প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’র বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলনে নেমে পড়ে এবং উক্ত ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে গ্রাহকদের মাঝে জানাজানি হলে গত ২৩ জানুয়ারি ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’সহ তিনটি অফিস তালাবদ্ধ করে সেসহ তার অন্যান্য সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে যায়।
এ বিষয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী মিরপুর মডেল থানায় গত ২ ফেব্রুয়ারি ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। এর পরপরই র্যাব-৪ এর গোয়েন্দা দল উক্ত মামলার ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং জালিয়াতির রাজা প্রতারক ফারুকের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়।
ওমর ফারুকের উত্থান
ওমর ফারুক (৩২) নোয়াখালী জেলার কবিরহাট থানাধীন সাগরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। সে স্থানীয় একটি স্কুল হতে ২০০৯ সালে এসএসসি পাশ করে ২০১৪ সালে ঢাকায় চলে এসে মগবাজার এলাকায় একটি বিকাশের দোকানে চাকরি শুরু করে। ২০১৫ সালে মিরপুরের আহম্মেদনগর এলাকায় নিজে বিকাশের ব্যবসা শুরু করে। প্রতারণার উদ্দেশ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে সে বিভিন্ন ব্যাংকে ৫টির অধিক অ্যাকাউন্ট খোলে। পরবর্তীতে সে ২০১৮ সালে মিরপুর-২ এর ১৩ নং ওয়ার্ডের ৬০ ফিট এলাকায় ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’ নামে একটি এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। ওমর ফারুক তার এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকার গ্রাহকের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতো। গত ২০১৮ সাল থেকে তিতাস গ্যাস, ওয়াসা ও ডেসকোর গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল সংগ্রহ করে জমা না দিয়ে বিলের টাকা আত্মসাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
র্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘তার সহযোগী তিতাসের কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখছে র্যাব। যদি কেউ জড়িত থাকে তাহলে আমরা তিতাস কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানিয়ে দেবো।’
প্রতারিত সবাই মামলা করলে তারা ভবিষ্যতে ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন বলেও জানায় র্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক।
ভুক্তভোগী মো. আকতার মোল্লা চারতলা বাড়ির মালিক। তিনিও গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎবিল জমা দেয় ওমার ফারুকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতিষ্ঠানে। তার পানি ও বিদ্যুৎ বিল জমা হলেও গ্যাস বিল জমা হয়নি।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৮ সালে মিরপুরের ৬০ ফিটের বিভিন্ন বাসায় গিয়ে ওমর ফারুক সবাইকে তার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বিল জমা দিতে বলে। বাড়ির কাছে বিল জমা দেওয়ার সুযোগ থাকায় সবাই সেখানে বিল দেওয়া শুরু করে। তবে গ্যাস বিল সে জমা দেয়নি।’
আক্তার মোল্লা অভিযোগ করেন, ‘এর আগে বিল জমা হলে খোঁজ নিতো তিতাস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ওমর ফারুকের এজেন্টের মাধ্যমে বিল দেওয়ার পর দুই বছর ধরে তিতাস আর খোঁজ নেয়নি। আমার অভিযোগ হলো, তিতাস বিল না পেয়েও দুই বছর চুপ ছিল কেন? তারা নিশ্চয় জড়িত। তারা জানতো।’
ভুক্তভোগী হৃদয় বলেন, ‘টাকা আত্মসাত করে পালিয়ে যাবার পর তিতাস মাইকিং করে জানিয়েছে তারা বিল পায়নি। তারা যদি আগে গ্রাহকদের জানাতো তাহলে ওমর ফারুককে তখনই গ্রেফতার করা যেতো।’
ওমর ফারুকের মাল্টি প্রতারণা
ভুক্তভোগী হৃদয় বলেন, ‘ওমর ফারুক মার্কেন্টাইল ও সিটি ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করেছিলো। তার প্রতিষ্ঠানে সবাই সেভিং অ্যাকাউন্টে টাকাও জমা দিতো। ২০১৮ সাল থেকে জালিয়াতি করে আসছে। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতারণা ছাড়াও সে অটুট বন্ধন নাম একটি এমএলএম প্রতিষ্ঠান চালু করে। তা দিয়েও মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এ ছাড়াও সে ‘নব ক্যাশ’ নামে মোবাইল ব্যাংকিং শুরু করেছিল। যা সবই অবৈধ।’
প্রতারক ওমরের সঙ্গে তিতাসের কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখছে র্যাব। তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।









