গণপরিহন বন্ধ করে দিয়ে সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলা রেখেছে সরকার। অ্যাপভিত্তিক পরিবহন উবার-পাঠাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে মহাউল্লাস চলছে রিকশাওয়ালাদের। অনেকেই বলছেন, নিষিদ্ধ না হওয়ায় যেন ঈদ লেগেছে রিকশাওয়ালাদের। পিছিয়ে নেই সিএনজি চালকেরাও। রাজধানী বাসীর এখন চলাচলের বাহন এই রিকশা আর সিএনজি। তবে চুক্তিভিত্তিক যাতায়াতে মোটরসাইকেলও মিলছে। সুযোগ পেয়ে পণ্য পরিবহন ছেড়ে রাস্তায় মানুষ পরিবহন করছে ভ্যানওয়ালারা। তবে সর্বত্রই এখন ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য চলছে। কোনও হিসাব নিকাশ ছাড়াই ২০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা দাবি করে বসে থাকে এসব বাহনের চালকেরা। এসব দেখার যেন কেউ নেই। এমন পরিস্থিতিতে নিম্নআয়ের মানুষেরা পড়েছে মহাসঙ্কটে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, মাতুয়াইল মেডিক্যাল বাসস্ট্যান্ড থেকে গুলিস্তান ফ্লাইওভারের ওপর নামিয়ে দেওয়ার শর্তে এক সিএনজিতে ৫জন যাত্রী বহন করছে। প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১০০ টাকা করে। পাঁচজনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা। অথচ সিএনজিতে এই দূরত্বের স্বাভাবিক সময়ের ভাড়া সর্বোচ্চ ১৫০ টাকার বেশি নয়। তারপরও মানুষ দায়ে পড়ে এসব পরিবহনে চলাচল করছে। কারণ রিকশায় গুলিস্তানে আসতে ভাড়া চায় ২০০ টাকা। মোটরসাইকেলে ২৫০ টাকা।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, রাজধানীতে এখন পরিবহন নৈরাজ্য চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২ সিটের একটি রিকশায় দুজন বসলে একজনকে নামিয়ে দিচ্ছে। কারণ দুজন বসলে সামাজিক দূরত্ব বাজায় থাকে না। সেক্ষেত্রে ভাড়া শেয়ারিংয়েরও ব্যবস্থা নেই। একজনের পক্ষে ২৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে ৫/৬ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করা সম্ভব নয়। পুলিশ এক রিকশায় ২জন যাত্রী বসতে দেয় না, অথচ এক সিএনজিতে ৫জন তুলে নিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনও বাধা নেই। শুধু রিকশা নয়, মোটরসাইকেল এমনকি প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস থেকেও নগরবাসীকে নেমে যেতে বাধ্য করছেন।
একই অবস্থা রাজধানী জুড়ে। মিরপুর-১০ থেকে খামারবাড়ি পর্যন্ত রিকশা ভাড়া ৩০০ টাকা। একজন হলে ১৫০ টাকা। যানবাহন না থাকায় পায়ে হেঁটে অফিস করছেন মধ্যবিত্তরা। উচ্চপদস্থরা তো নিজের বা অফিসের গাড়িতে চড়ে অফিস করছেন। তারা তো গাড়ির মধ্যে বসে রাস্তার দুরবস্থা বুঝতে পারেন না— এমন মন্তব্য করেছেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মচারী। ধোলাইরপাড় থেকে ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে দিলকুশায় অফিসে এসেছেন তিনি। যাবেন কিভাবে তা জানেন না। কারণ তার পক্ষে আবার ২০০ টাকা দিয়ে বাসায় ফেরা সম্ভব নয়, পকেটে এতো টাকা নাই।
বাসাবো থেকে মতিঝিল আসতে দুজন মিলে রিকশা নিয়েছেন ৩০০ টাকা দিয়ে। খিলগাঁও রেললাইনের কাছাকাছি এলে পুলিশ একজনকে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে এক যাত্রী বলেন, রিকশাওয়ালাদের যেন ঈদ লেগেছে। ভাড়া তিন-চার গুণ বেশি। তবুও রক্ষা নেই। পুলিশ নামিয়ে দিলো। পুলিশ তো নামিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলো। কিন্তু কিভাবে গন্তব্যে যাবো তার তো কোনও ব্যবস্থা নেই। অফিস, কর্মস্থল, ব্যবসা বাণিজ্য খোলা রাখবেন গাড়িও বন্ধ, আবার রিকশায় চড়তে দেবেন না— এটা তো একপ্রকার জুলুম।
অতিরিক্ত ভাড়ায় রিকশা ও প্যাডেলচালিত ভ্যানে অনেককে গন্তব্যের উদ্দেশে রওয়ানা দিতে দেখা যায়। অনেকে পায়ে হেঁটেও ছুটে চলেছেন কর্মস্থলে।
ভাড়া নৈরাজ্যের পাশাপাশি রাজধানী জুড়ে চলছে এখন ভয়াবহ যানজট। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, ১ জুলাই সারাদেশে কঠোর লকডাউনের সংবাদ পেয়ে অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে চলমান লকডাউনের মাঝেও মানুষ নানাভাবে গ্রামে ফিরছে। তাই রাস্তায় এতো যানবাহন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে মোটরসাইকেলে আরোহী বহন না করতে অনুরোধ জানানো হলেও তা মানা হচ্ছে না। মোটরসাইকেল চালক মোস্তফা জানান, ভয়ে ভয়ে রাস্তায় নেমেছি। সকালের দিকে কিছুটা নির্ভয়ে ২/১টা ট্রিপ মারলেও এখন যাত্রী নিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছি না। পুলিশ ঝামেলা করতে পারে।
সকালে নগরীর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, খিলগাঁও রেলগেট, শাহজাহানপুর, রাজারবাগ, ফকিরাপুল, রামপুরা, বাড্ডা, কুড়িলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অফিস পরিচালনায় প্রয়োজনীয় কর্মচারীর জন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবহনে ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও অধিকাংশ মানুষের অভিযোগ প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা করেনি।
তুবা রহমান নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে মালিবাগ রেলগেট এলাকায় রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি বলেন, বাস তো নাই, ঘন্টাখানেক হলো দাড়িয়ে আছি রিকশার জন্য। খালি রিকশাও পাচ্ছি না। পেলেও ভাড়া বেশি চায়। পরিবহন বন্ধ করে দিয়ে অফিস খোলা রাখার এসব সিদ্ধান্ত যেসব কর্মকর্তারা দেন, তারা গণপরিবহনে চড়েন না। চড়েন সরকারি গাড়িতে। তাই তারা বোঝেন না, গণপরিবহন বন্ধ করে অফিস খোলা রাখলে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের কী পরিমাণ কষ্ট পোহাতে হয়।









