রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কবে নাগাদ স্বয়ংক্রিয় হবে? সিটি করপোরেশন বলছে, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অপরদিকে পুলিশ বলছে, সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কখন কার কাছে হস্তান্তর করলো, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে। দু’টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনও প্রজেক্ট বা কার্যক্রম হস্তান্তর হলে চিঠিপত্র আদান প্রদান হবে না? অথচ উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালের দায়-দায়িত্ব নিরূপণে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটির প্রতিবেদনে যেসব প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো এখনও অনুমোদন হয়নি। কবে নাগাদ অনুমোদন হবে তাও বলতে পারছেন না কেউ।
পুলিশ ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময় ১০৯টি স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ৯৮টি সিগন্যালই বর্তমানে বিকল। বাকিগুলো বিকল না হলেও সেগুলোর কোনও কার্যক্রম নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের জন্য প্রথম ২০০১-২০০২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের (ডিইউটিপি) মাধ্যমে ৭০টি ইন্টারসেকশনে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগনাল স্থাপন করা হয়। এর দীর্ঘদিন পর ২০১২-১৩ অর্থবছরে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের আওতায় ইন্টারসেকশনে বিদ্যমান ৭০টি ট্রাফিক সিগন্যালের উন্নয়ন ও সচল করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির আওতায় আরও ২৯টি ইন্টারসেকশনে নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঢাকা নগরীর ৪৩টি ইন্টারসেকশনে পুনরায় ট্রাফিক সিগন্যালকে সচল করার কাজ শুরু করা হয়, যা ২০১৯ সালের ২০ মার্চ শেষ হয়।
রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাস্তবায়নে বিভিন্ন পর্যায়ে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, চেষ্টা করেও সেই তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। কী কারণে এতগুলো বছর পরেও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি চালু হলো না, তারও সঠিক কোনও জবাব পাওয়া যায়নি কারও কাছ থেকে। তবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সিগন্যালগুলোর ভূগর্ভস্থ ক্যাবল বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণকে দায়ী করেছেন তারা।
সিগন্যালগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের জন্য একবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১৪ সালের মার্চে। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফায় পুলিশের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু এই সিগন্যাল পরিচালনায় পুলিশের দক্ষ জনবল না থাকায় সেটা হয়নি।
জানা যায়, রাজধানীর স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতির অব্যবস্থাপনার দায় নিরূপণে আইনজীবী মনোজ কুমার ভৌমিক ও সুলাইমান হাওলাদার উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। পরে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করেন। এরপর স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে আদালতের জবাব ও কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ, নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের প্রজেক্ট ডিরেক্টর (দক্ষিণ সিটি অংশ) সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ট্রাফিক সিগন্যালগুলো আরও দুই বছর আগেই পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি। যত দূর শুনেছি, তারা এ নিয়ে একটা মহাপরিকল্পনা নিচ্ছে। কীভাবে একটি কন্ট্রোল রুম থেকে সব বাতি সচল করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। তাছাড়া মেট্রোরেলের কার্যক্রমের কারণে অনেক সিগন্যাল এমনিতেই বন্ধ রয়েছে। কিছু কিছু খুলে রাখা হয়েছে। সব করিডোরে একযোগে সিগন্যাল চালু করতে না পারলে কোনও কাজে আসবে না। সে কারণে এই পদ্ধতি কার্যকর করা যাচ্ছে না।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতির কাজ চলছে। এটা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সদস্য নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির পক্ষ থেকে সম্ভাব্যতা যাচাই করে সিটি করপোরেশনকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সেটা মূল্যায়ন করে তারা অনুমোদন দিলে এর কাজ এগিয়ে যাবে। এটা মূলত সিটি করপোরেশন করবে।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এআইজি একেএম মোশাররফ হোসেন মিয়াজি বলেন, ‘এর দায় দায়িত্ব নিরূপণে হাইকোর্ট থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশের একজন কর্মকর্তা ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তার সমন্বয়ে। এই কমিটি একটা প্রতিবেদনও দিয়েছে।’
সিস্টেমটি পুলিশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি সত্য নয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এটার জন্য একটা কমিটি হয়েছে। প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোথাও বলা হয়নি যে এই প্রজেক্ট হস্তান্তর করা হয়েছে।’
মোশাররফ হোসেন মিয়াজি বলেন, ‘যখন ডিজিটালি ট্রাফিক সিস্টেম চলে না, তখন তারা (সিটি করপোরেশন) ২৫টি রিমোট দিয়েছিল। সেগুলো ব্যবহার করার জন্য ২৫ জন সার্জেন্টকে দেওয়া হয়েছিল। পুরো ঢাকা শহরে তো ২৫টি রিমোট দিয়ে হবে না। এগুলো মূলত পরীক্ষামূলক আনা হয়েছিল। এগুলো আবার দু’দিন চলে দু’দিন চলে না। ডিস্টার্ব করছিল। কয়েকদিন পর সবই শেষ।’
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন









