বৈশাখ মাসের প্রথম দিন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হালখাতা খোলার দিন। কিন্তু হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে আজ (২ বৈশাখ) পুরনো হিসাব চুকিয়ে ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার পালা। বিগত দু’বছর করোনা মহামারির কারণে ঠিকমতো হালখাতা অনুষ্ঠান করতে পারেননি পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা। এবার তাই রোজার মধ্যেও বৈশাখের অনুষ্ঠান ও হালখাতার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আগে থেকে অন্যরকম আমেজ কাজ করছে ব্যবসায়ীদের মাঝে। তবে অনেকটা সাদামাটাভাবে চলছে শত বছরের ঐতিহ্য পুরান ঢাকার হালখাতা।
শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) বৈশাখের দ্বিতীয় দিনে সবার মঙ্গল কামনায় বিগত বছরের সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন বছরের জন্য হালখাতা খুলেছেন শাঁখারি বাজার ও তাঁতী বাজারের ব্যবসায়ীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলা নববর্ষের হালখাতার আয়োজন থাকলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের পঞ্জিকা অনুসারে আজ হালখাতা উৎসব করছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজার ও তাঁতী বাজারের ব্যবসায়ীরা হালখাতা পালন করছেন। দোকানপাট পরিষ্কার করে বেলুনসহ নানা ধরনের বর্ণিল সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে। দোকানে দোকানে ফুলের গেট, বৈশাখের প্ল্যাকার্ড, মঙ্গলঘট, সোলার ফুল, মালাসহ নানা সামগ্রীর বর্ণিল সাজ। হালখাতার আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে তাঁতী বাজারে। পূজা-অর্চনায় মঙ্গল কামনা করে দোকান শুরু করতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের। এছাড়াও দোকানে দোকানে লালখাতা আর ক্যালকুলেটর নিয়ে চলছে হিসাব-নিকাশ। হিসাব শেষে মিষ্টি মুখ করছেন ক্রেতারা। রমজান থাকায় মুসলিম ক্রেতাদের মিষ্টির প্যাকেট ও ডায়েরি উপহার দিচ্ছেন দোকানিরা।
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে ঘিরে বরাবরই রঙিন সাজে মেতে ওঠে পুরান ঢাকা। মোঘল সম্রাট আকবর বৈশাখকে প্রথম মাস ধরে বাংলা বছর গণনা চালু করার পর থেকেই পহেলা বৈশাখের প্রচলন শুরু হয়। এ দিন বছরের সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা খোলেন ব্যবসায়ীরা। আনন্দ-আয়োজন আর আপ্যায়নে তা খোলা হয়ে থাকে। পুরান ঢাকার সদরঘাট, তাঁতী বাজার, শাঁখারি বাজারের জুয়েলার্স ও অলংকার তৈরির কারখানা, শ্যাম বাজার, চক বাজার ও ইসলামপুরের কাপড়ের দোকানগুলোতে প্রতিবছরই হালখাতা হয়।
শাঁখারি বাজারের অলংকার ব্যবসায়ী জে এম জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শোভন বলেন, ‘আমরা শাঁখারি ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকি। পুরাতন হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাব শুরুর দিন এটি আমাদের। হালখাতা মানে যে শুধু পুরনো হিসাব চুকানো তা নই, এটি আমাদের কাছে একটি উৎসব। করোনার কারণে গত দুবছর হালখাতা বন্ধ ছিল। তবে হালখাতা অনুষ্ঠানের সেই আয়োজন বেশ কিছু বছর হলো আগের মতো আর নেই। আগে হালখাতার এক-দুই সপ্তাহ আগেই দোকানপাট সাজানো হতো। আগের মতো এখন আর অতো জমজাটভাবে অনুষ্ঠান হয় না। এ বছর সাদামাটাভাবে চলছে আমাদের এবারের হালখাতা।’
তাঁতী বাজারের মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক সুজোন ঘোষ বলেন, ‘দীর্ঘ দুই বছর পর পহেলা বৈশাখে হালখাতার আয়োজন করছি। বিগত সময়ে ব্যবসা পরিস্থিতি অনেকটা মন্দায় কেটেছে। তবে আজকে কাস্টমারদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। হিন্দু ক্রেতাদের মিষ্টি মুখ করাচ্ছি। মুসলিম ক্রেতাদের জন্য মিষ্টি ছাড়াও, ডায়েরি, কলমসহ নানা উপহার দিচ্ছি আমরা। আজকে শুক্রবার হওয়ায় মানুষ ঘর থেকে তেমন বের হয়নি। ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে প্রতিবছরের মতো এবারও হালখাতার আয়োজন করেছি। তবে আগামীতে যেন আরও সুন্দর হয় সেই প্রত্যাশা করছি।’
শাঁখারী বাজারে রাহুল নামের আরেক ব্যবসায়ী জানান, হালখাতার অবস্থা তেমন ভালো না। বাজারের কোনও দোকানই তেমন সাজানো হয়নি। তবে হালখাতার হিসাব চলছে। কিছু কিছু কাস্টমার আসছে, তাদের সঙ্গে দেনাপাওনা মিটিয়ে মিষ্টি বিতরণ করছি। পুরান ঢাকায় এখনও হালখাতার যে ঐতিহ্য তা ধরে রেখেছে শাঁখারি বাজারের ব্যবসায়ীরা।









