কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন বা কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী, বিশেষ শ্রেণির কেপিআইগুলোর সীমানা প্রাচীরের ২৫ মিটারের মধ্যে কোনও স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এতে আরও বলা হয়, সীমানা প্রাচীরের ১৫০ মিটারের মধ্যে দোতলা বা ৮ দশমিক ৭৫ মিটারের বেশি উচ্চতার কোনও ইমারত নির্মাণ করা যাবে না।
রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবন—যা বিশেষ কেপিআই শ্রেণির স্থাপনা। কিন্তু বঙ্গভবনের মাত্র ১৬ দশমিক ৬৭ মিটারের মধ্যে দিলকুশায় দাঁড়িয়ে আছে ‘সানমুন টাওয়ার’ নামে একটি ২৪ তলা ভবন। এই ভবনের বেশিরভাগ অংশেই দিন-দুপুরেও থাকে ভুতুড়ে অন্ধকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বহুতল এই ভবনটি বঙ্গভবনের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের (২০২২) জুলাই মাসে সানমুন টাওয়ারসহ বঙ্গভবনের চারপাশের কেপিআই নীতিমালা লঙ্ঘনকারী ভবন অপসারণে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু ২৪ তলা সানমুন টাওয়ারটি কারা ভাঙবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে ডিএসসিসি ও রাজউক।
দক্ষিণ সিটির সম্পত্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৩৭ দিলকুশা এলাকার চার কাঠার খালি প্লটটি ছিল বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের। পাটকল কর্তৃপক্ষ শর্তসাপেক্ষে এ জায়গাটি সিটি করপোরেশনকে দিলে ২০০৩ সালে অবিভক্ত সিটি করপোরেশন পাঁচতলা একটি ভবন তৈরি করে। পরে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন ২০০৯ সালে একটি ২৩ তলা ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে এমআর ট্রেডিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক ভবনের ৩০ ভাগ পাবে সিটি করপোরেশন ও নির্মাতা কোম্পানি পাবে ৭০ ভাগ। কিন্তু দেখা যায়, নির্মাতা কোম্পানি এমআর ট্রেডিং চুক্তি ভঙ্গ করে অদৃশ্য শক্তির জোরে ওই জায়গায় ৩০ তলা ভবন নির্মাণ করে।
পরে বিষয়টি জানাজানি হলে নিরুপায় হয়ে নির্মাতা কোম্পানি নিজ উদ্যোগে ভবনের ছয়টি ফ্লোর ভেঙে ফেলে। ভবনটির ২৪ তলা পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে। পরে ২০১৩ কেপিআই নীতিমালা হলে এই ভবনের নির্মাণকাজে সরকারিভাবে বাধা আসে। বর্তমানে ভবনটির বেশিরভাগ অংশই অব্যবহৃত রয়েছে।
জানা গেছে, সানমুন টাওয়ার ভেঙে ফেলার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত জুলাইয়ে বঙ্গভবন থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও রাজউককে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ নেয়নি রাজউক বা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বঙ্গভবনের নিরাপত্তার জন্য ভবনটি ভাঙতে হবে। ভবনটি ভেঙে ফেলতে বঙ্গভবন থেকে রাজউককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমাদেরও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। ভবনটি রাজউকেরই ভাঙার কথা।’
তিনি জানান, সোমবার (৯ জানুয়ারি) সিটি করপোরেশনের সার্ভেয়ার ভবনটি বুঝে নেবে।
অপরদিকে, রাজউকের অথরাইজড অফিসার জোটন দেবনাথ বলেন, ‘ভবনটি সিটি করপোরেশনের। এই ভবনের নকশাও অনুমোদন করেছে সিটি করপোরেশন। তাদের ভবন তারা ভাঙবে, প্রয়োজনে আমরা সহায়তা করবো।’
বিষয়টি জানতে দক্ষিণ সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তাকে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
কেমন আছে ২৪ তলা সানমুন টাওয়ার
রবিবার (৮ জানুয়ারি) সরেজমিন ৩৭/ক, দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দৈত্যাকৃতির ভবনটির বড় অংশই একটি পরিত্যক্ত ভবনের চেহারা নিয়েছে।
ভবনের বেসমেন্ট থেকে ছয়তলা পর্যন্ত এখনও মনে হচ্ছে নির্মাণাধীন। প্রতিটি তলায়ই দিনের বেলা বিরাজ করছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যত্রতত্র পড়ে আছে নির্মাণ সামগ্রী।
ভবনের গেটে কথা হয় মুন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সানমুন টাওয়ারের ব্যবস্থাপক শাহজাহান সিরাজের সঙ্গে।
তিনি জানান, ভবনের ১-৫ তলা, ২১ ও ২২ তলা সিটি করপোরেশনের, ৮ ও ৯ তলা বিজেএমসির এবং বাকিগুলো নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমআর ট্রেডিংয়ের।
শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘বর্তমানে ভবনটির ১০ তলা সাউথ বাংলা ব্যাংক ভাড়া নিয়েছে। আর ২১ তলায় এমআর ট্রেডিংয়ের মালিক মিজানুর রহমানের মালিকানাধীন একটি পত্রিকার অফিস।
তিনি বলেন, ‘ছয়তলা পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের কার পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ হলেও করপোরেশন তাদের ফ্লোরগুলো ব্যবহার করছে না। করোনার সময় আমাদের নিজস্ব কয়েকটি ফ্লোরের ভাড়াটে চলে গেছে। ফলে সেগুলো এখন খালি অবস্থায় রয়েছে।’
ভবনটি ভাঙার বিষয়ে তিনি কোনও নোটিশ পাননি বলে জানান শাহজাহান সিরাজ।
কেপিআই নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভবন নির্মাণের সময়ে এই নীতিমালা ছিল না। নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এটি প্রণয়ন করা হয় এবং তখন থেকে কাজে বাধা আসে।’
তিনি অভিযোগ করেন, বঙ্গভবনের ১৫০ মিটারের মধ্যে পিপলস টাওয়ার ও ইউনুস সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি সরকার-বেসরকারি হাইরাইজ ভবন রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে কেউ কিছু বলছে না।’









