নিমতলী ট্র্যাজেডি

এক যুগ পেরোলেও কোনও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি নিমতলীতে

কবির হোসেন
০৩ জুন ২০২৩, ২১:০০ আপডেট : ০৩ জুন ২০২৩, ২১:০০

১৩ বছর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকায় ঘটে যায় স্মরণকালের ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এলাকার নবাব কাটারার ৪৩ নম্বর বাড়িতে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি থেকে সৃষ্ট আগুন সেদিন কেড়ে নেয় ১২৪ জনের প্রাণ। ভয়াল সেই অগ্নিকাণ্ডের কথা স্মরণ করে প্রতিবছরের এই দিনে গুমরে কেঁদে ওঠেন নিমতলীবাসী। স্বজনরা এসে মাগফিরাত কামনা করেন, দোয়া মাহফিল করেন; ভেঙে পড়েন আহাজারিতে।

ভয়াল সেই দুর্ঘটনার পর পুরান ঢাকার গিঞ্জি আবাসিক এলাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিক পদার্থের দোকান, গুদাম ও কারখানা অপসারণ করার দাবি ওঠে জোরালোভাবে। ট্র্যাজেডির পর সরকারের পক্ষ থেকে টাস্কফোর্স গঠন, অঙ্গীকার ও পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৩টি বছর কাটলেও কোনও পরিবর্তন আসেনি ওই এলাকায়। সেই সরু রাস্তা, গাদাগাদি দোকানপাট, বাড়িঘরের মাঝে রাসায়নিক পদার্থের দোকান, গুদাম ও কারখানা আগের মতোই আছে। আজও এসবের বাস্তবায়ন না দেখায় শঙ্কা কাটেনি পুরান ঢাকাবাসীর।

শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, আগের মতোই সরু রাস্তা। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেছে পথচারীরা। যেই ছয়তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, সেটির সামনে কয়েক গজ দূরে গ্যাসের বড় বড় সিলিন্ডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে রান্না করছেন একটি রেস্তোরাঁর কর্মীরা। এতে যেকোনও সময় ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা। এ ছাড়া ভবনটির নিচে থেকে ওপরে প্রায় অর্ধেকজুড়ে রয়েছে বিদ্যুতের হাইবোল্টেজের ট্রান্সমিটার। ভবনটির প্লাস্টার ছাড়া কাঠামোগত কোনও পরিবর্তন হয়নি। আশপাশেও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে আরও অনেক ভবন। এলাকার ব্যবসায়ীদের কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই যে এখানেই ঘটেছিল স্মরণকালের ট্র্যাজেডি।

ছবি: সংগৃহীত

ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের দিন সাত বছর বয়সী ছেলে বৈশাখকে নিয়ে ওই ভবনটির বিপরীতে এক কোনায় ফলের দোকানদারি করছিলেন মো. মামুন মিয়া। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে কোনো দিকে সরা সম্ভব হয়নি। চোখের সামনেই তার ছেলে প্রাণ হারায়। ছেলে হারানোর ক্ষত না শুকাতেই সেখানেই ফের ব্যবসা শুরু করেন মামুন মিয়া।

তার দোকানে একটি সাইনবোর্ডে ছেলের স্মৃতি রেখে লিখেছেন, ‘৩ জুন নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে আমার চোখের সামনে আব্বু ডাক দিয়ে চিরতরে চলে গেল আমার আদরের ছোট ছেলে বৈশাখ (৭)। পারিনি তাকে বাঁচাতে হিংস্র আগুনের লেলিহান থেকে। কী যে বুকভরা কষ্ট নিয়ে এই দোকানে ছেলের সকল স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে ফলের দোকান করছি এই হতভাগা দরিদ্র বাবা।’

ভবনটির প্লাস্টার ছাড়া কাঠামোগত কোনও পরিবর্তন হয়নি। রয়েছে বিদ্যুতের হাইবোল্টেজের ট্রান্সমিটার

জানতে চাইলে মামুন বলেন, ‘২০০৫ সাল থেকে আমি এখানে ব্যবসা করছি। ওদিন মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে আমরা আর কেউ ঠিক সময় বের হতে পারিনি। আমার শিশু ছেলে আমার সামনে শেষ হয়ে গেলো। আমার অর্ধেক শরীর দগ্ধ হয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে এভাবেই আছি এখন। এখানে থেকে আর কোথায় যাবো? কী করবো? আমার বয়স যখন ১০ বছর তখন থেকে এ এলাকার ফুটপাতে ব্যবসা করি।

অগ্নিকাণ্ডের সময় এলাকার একটি দোকানে কাজ করতেন কিশোরগঞ্জের মো. রামিম। নিজ চোখে দেখেছেন সেদিনের ভয়াবহতা। তার ভাষায়, এই স্মৃতি তাকে তাড়া করে প্রায়ই। আজও তার চোখে ভাসে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের ছটপট ও মৃত্যুযন্ত্রণা। এসব দেখে ভয়ে সে মাসেই ঢাকা ছেড়ে কিশোরগঞ্জে গ্রামের বাড়ি চলে যান। সাত বছর পর আবার এসে আগের জায়গায় কাজ শুরু করেন।

গ্যাসের বড় বড় সিলিন্ডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে রান্না করছেন রেস্তোরাঁর কর্মীরা

রামিম বলেন, এত বড় দুর্ঘটনার পরও এই এলাকার কোনও উন্নতি নেই। কোনও পরিবর্তন নেই। কোনও সচেতনতাও নেই। আগের মতোই আছে সব। একটি সরু রাস্তায় শত শত লোক ব্যবসা করছে। ভয় লাগে চলাচল করতে। তারপরও পেটের দায়ে কাজ করি এই এলাকায়।

নিমতলীর বাসিন্দা ও সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রনি বলেন, আমার জন্ম নিমতলী এলাকায়। এ ঘটনায় আমার অনেক আত্মীয়স্বজন নিহত হয়েছে। আমাদের চোখের সামনে আগুন লেগেছে, কিছুই করতে পারিনি। ঘটনার এতদিন পরও এলাকার কোনও পরিবর্তন নেই। দেখতেই পারছেন। এমনি ছোট রাস্তা, সেখানে মানুষের চলাচল, পথে পথে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে রান্না করছে। বাড়িটিরও কোনও পরিবর্তন নেই। একটু প্লাস্টার করেছে। আগের মতোই মানুষের বসবাস ও চলাচল। 

এক যুগ পেরোলেও কোনও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি নিমতলীতে

ভবনটির সামনে এক ব্যবসায়ী বলেন, ঘটনার ১৩ বছর হয়ে গেল অথচ কোন ব্যক্তি ওই কেমিক্যাল রাখছিল, বিষয়টি আমরা আজও জানতে পারিনি। এগুলো কে দেখবে? আবার যে এমন ঘটনা ঘটবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা আছে? বেশি কথা বলতে চাই না। আমরা আমাদের কষ্ট নিয়ে আছি। এখানে যাদের দেখছেন, আমাদের অনেকের স্বজন এই অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছে।

এদিকে শনিবার সকাল থেকে পুরান ঢাকার নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ওই ভবনটির সামনে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন তাদের স্বজনসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা। আসরের নামাজের পর নিহতের আত্মার শান্তি কামনায় নিমতলী এলাকার মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

ছবি: সংগৃহীত

যা ঘটেছিল সেদিন নিমতলীতে
২০১০ সালের ৩ জুন। রাত যখন ৯টা বাজে, তখন নিমতলীর নবাব কাটারার ৪৩ নম্বর ছয় তলা বাড়িতে রাসায়নিকের গুদামে হঠাৎ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনার আকস্মিকতা বোঝার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ের মধ্যে দগ্ধ হয়ে নিথর হয়ে পড়ে ১২৪ জনের প্রাণ। 

ঘটনাস্থলেই একই পরিবারের ১১ জনের মৃত্যু হয়। আর সামনের ৫৫ নম্বর বাড়ির ৬ জন ও বিয়েবাড়ি লাগোয়া বাড়ির আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়। সেই তিন কনেও হারান পরিবারের সদস্যদের।

ঘটনার সময় ছয়তলা বাড়িটির নিচতলায় দুই বোন রুনা আর রত্না ও পাশের বাড়িতে আসমা নামের এক তরুণীর বিয়ের আয়োজন চলছিল। তিন কনে তখন পারলারে সাজছিলেন। আর সেই বাড়ির নিচতলায় চলছিল রান্নার আয়োজন। তার পাশেই ছিল রাসায়নিকের গুদাম। তখন ধারণা করা হয় আগুনের প্রচণ্ড তাপে গুদামে থাকা রাসায়নিকের প্লাস্টিকের ড্রাম গলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃস্নেহে তিন কনের দায়িত্ব নেন। তাদের জন্য গণভবনে বিয়ের আয়োজন করেন তিনি। তিনজনকে মেয়ের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের স্বামীদের চাকরি দেন প্রধানমন্ত্রী।

/এনএআর/
সম্পর্কিত
প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে ঢাকায় ১৬ হাজার পুলিশ: ডিএমপি
একদিনে হামের উপসর্গে আরও একজনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১০১০
অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে অতিরিক্ত ডিআইজির সেই বাড়িতে কী কী হতো
সর্বশেষ খবর
যে কারণে আকস্মিক রিয়াদ সফরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট
যে কারণে আকস্মিক রিয়াদ সফরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট
পূজামণ্ডপে ‘ওরে ওরে হাওয়া’ গান গেয়ে প্রত্যাহার পুলিশ কর্মকর্তা, তদন্তের নির্দেশ
পূজামণ্ডপে ‘ওরে ওরে হাওয়া’ গান গেয়ে প্রত্যাহার পুলিশ কর্মকর্তা, তদন্তের নির্দেশ
সাইফ-পারভেজের জুটিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ
সাইফ-পারভেজের জুটিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ
ইরাকে জেদ থেকে কিছু করতে চায় বাংলাদেশ, সোনা জিতলে ৩ লাখ টাকা পুরস্কার 
ইরাকে জেদ থেকে কিছু করতে চায় বাংলাদেশ, সোনা জিতলে ৩ লাখ টাকা পুরস্কার 
সর্বাধিক পঠিত
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
পে-স্কেল: বেতন-ভাতা নির্ধারণে প্রস্তুতি কতদূর
পে-স্কেল: বেতন-ভাতা নির্ধারণে প্রস্তুতি কতদূর
স্থানীয় নির্বাচনে কেমন প্রার্থী বেছে নিতে হবে, সাফ জানিয়ে দিলেন তারেক রহমান
স্থানীয় নির্বাচনে কেমন প্রার্থী বেছে নিতে হবে, সাফ জানিয়ে দিলেন তারেক রহমান