গ্যাস সংকটের অজুহাতে রাজধানীর সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় রীতিমতো ভাড়া নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন চালকরা। চালক ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, স্বল্প দূরত্বে যেখানে ২০০ বা ২৫০ টাকায় যাওয়া যেত সেখানে ৩০০ টাকার নিচে কোনও ভাড়াই নেই। পুরো রাজধানীতে এমন অবস্থা চলছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
রাজধানীর বনশ্রীর মেরাদিয়ার বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, মেরাদিয়া থেকে তিনি ব্যবসায়িক কাজে প্রায় প্রতিদিন গুলশান-২ যেতেন। পূর্বে এই দূরত্বে ভাড়া দিতাম ২৫০ টাকা। শুক্রবার সকালে রাস্তা একটু ফাঁকা থাকে। এ সময় ২০০ টাকায়ও যাওয়া যেত। কিন্তু এখন ৩৫০ টাকা ভাড়া চায়। দামাদামি করলে ৩২০। এর নিচে আর আসে না। এমন কি ঘটলো যে, ১০০ টাকা বেশি ভাড়া চাচ্ছে। তারা গ্যাস সংকটের কথা বলে দাম বাড়ার কথা বলছে। কিন্তু সম্প্রতি সিএনজির কোনও দামই বাড়েনি।
একই এলাকার মিঠু চৌধুরী বলেন, তিনি ব্যবসায়িক কাজে তেজগাঁও আসতেন। এখন তেজগাঁওয়ের ভাড়াও ৩০০ টাকা চায়। আর আসার সময় ইউলুপ ঘুরে আসার বাহানায় ৩৫০ টাকা চায়। আগে যেখানে ২৫০ টাকা ছিল সেখানে এখন ১০০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে।
রামপুরা বাসিন্দা জুয়েল বলেন, রামপুরা থেকে আগে তিনি সিভিল এভিয়েশন হেডকোয়ার্টার বিমানবন্দরে যেতেন ৩০০ টাকায়। এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা চাচ্ছে তারা। বেশ কিছুদিন ধরেই ভাড়া বেশি নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কেন ভাড়া বেশি এমন কথা বললে চালকরা গ্যাসের দাম, ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ার মতো অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে।
শুধু এই রুটের ভাড়া বেশি নিচ্ছেন সিএনজি চালকরা এমন নয়। পুরো রাজধানীতে সিএনজি চালকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের থেকে আদায় করছেন। যারা সিএনজ চড়ে অভ্যস্ত তারা বেশি দিয়েই যাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, ধানমন্ডি, কাওরানবাজার, ফার্মগেট, টেকিন্যকাল, মিরপুর, উত্তরা, খিলক্ষেত, বসুন্ধারা ও বাড্ডা সব এলাকার সিএনজি চালকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
সংকট ও দাম বাড়ার অজুহাত
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, মাস খানেক আগে যে গ্যাস সংকট ছিল, সেই সময় থেকেই তারা ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন। অনেকে তখন তাদের প্রতি সহানুভূতি দিখিয়ে বেশি ভাড়া দিয়েছে। কিন্তু এখন যখন গ্যাস স্বাভাবিক হলো, তখন তারা আর ভাড়া কমালো না। আগের মতো ভাড়া নেওয়া অব্যাহত রেখেছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, এখন যখন গ্যাসের দাম বাড়লো, তখন তারা গ্যাসের দাম বাড়ার অজুহাত দিয়ে ভাড়া ইচ্ছেমতো আদায় শুরু করেছে।
আশরাফুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, তিনি প্রতিদিন বসুন্ধারা সিটি থেকে খিলগাঁও তালতলা যেতেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। কিন্তু এখন ৫০০ টাকা চায়। ৪৫০-এর নিচে প্রায় ২০ দিন আগে থেকে যেতে পারেনি।
তিনি বলেন, ভাড়ার নামে ডাকাতি করছে সিএনজি চালকরা। এমন অবস্থা চলতে পারে না। তাদেরও একটি সিস্টেমের মধ্যে আনা উচিত। দ্বায়বদ্ধতার জায়গায় আনতে হবে।
যা বলছেন চালকরা
খিলগাঁও এলাকার সিএনজিচালক আবু বকরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, আমরা তো ভাড়া একটু বেশি না নিলে চলতে পারবো না। গ্যাসের দাম বেড়েছে (যা মিথ্যা তথ্য) , টিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় ভাড়া বেশি না নিলে আমরা কীভাবে চলবো?
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আসলে দূরত্ব মেপে ভাড়া চাই না। আগে যেখানে আমরা ২৫০-তে যেতাম, সেখানে ৩০০ কিংবা ৩২০ এ যাচ্ছি। আমাদের সিএনজির জমা এখন প্রায় ১২০০ টাকা। গ্যাস নিয়ে সারাদিন চালিয়ে যদি চলতেই না পারি তাহলে সারাদিনের পরিশ্রম কোথায় গেলো। এ কারণে আমরা ভাড়া একটু বেশি নিচ্ছি।
রামপুরার সিএনজিচালক আতাউর বলেন, এ সময় ভাড়া একটু বেশি না নিলে আমাদের চলে না। গ্যাসও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আমাদের করার কী আছে?
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এটা না নিলে তো আমাদের জমা দিয়ে কিছু থাকবে না। একবার গাড়ি নামিয়ে রাস্তায় যে জ্যাম, আমরা সারা দিন কয়টা ভাড়া মারতে পারি।রাজধানীতে সিএনজির ভাড়ায় রীতিমত নৈরাজ্য
প্রসঙ্গত, ইরান যুদ্ধের পর থেকে শুরু হয় গ্যাসের চরম সংকট। পাম্পগুলো অধিকাংশই বন্ধ হয়ে যায়। যে কয়েকটি চালু রাখে সেগুলো কিলোমিটারজুড়ে লাইন শুরু হয়। একবার লাইন দিলে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা কোথাও কোথাও ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ দীর্ঘ অপেক্ষার পরও গ্যাস মিলেছে সামান্য টাকার। প্রায় মাস জুড়েই এই অবস্থা বিরাজ করছিল। সে সময় গ্রাহকরা বেশি ভাড়াতেই যাতায়াত করতো। এখন গ্যাস সরবরাহ আগের চেয়ে ভালো হলেও সেই বাড়তি ভাড়ার নিচে এখন কেউই যেতে চায় না।
বড় যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম লিটারে প্রায় ১২ টাকা বাড়ায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে অটোগ্যাসের প্রতি লিটারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা। কিন্তু সিএনজি চালকরা সেটাই এখন গ্রাহকদের বোঝাতে চাইছেন যে, তাদের গ্যাসের দাম বেড়েছে। আসলে তো তাদের ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়নি। তবে সরবরাহ কম। চাপ কমের অভিযোগ সত্য।