আর মাত্র একদিন পরই (বৃহস্পতিবার) নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশে প্রথমবারের মতো সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনে একাধিক রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও মূল লড়াই হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আর চির-প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত দুই প্রার্থীর মধ্যে। ভোটযুদ্ধ হবে নৌকা আর ধানের শীষে। স্থানীয় সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হলেও এতে আমেজ পাচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের। আর এ কারণেই পুরো দেশবাসীর চোখ এখন নারায়ণগঞ্জের দিকে। কে হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের পরবর্তী মেয়র—পুরো দেশ এখন সেই হিসাবই কষছে।
এই নির্বাচন স্থানীয় সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানের হলেও এটাকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। নির্বাচন এই দুই দলের জন্য অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে মনে করছে নারায়ণগঞ্জসহ গোটা দেশবাসী। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয়ই এই নির্বাচনকে দেখছে নিজ-নিজ দলের জনপ্রিয়তা প্রমাণের মাপকাঠি হিসেবে। এজন্য দলীয় প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে দুই দলই মরিয়া হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জিতে সরকারের জনপ্রিয়তার জানান দিতে চাচ্ছে। এদিকে টানা ৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এ নির্বাচনের হাত ধরে দলকে চাঙ্গা করতে চাচ্ছে।
সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে দ্বিতীয়বারের মতো ভোট হলেও এবার প্রথমবার ভোট হচ্ছে দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য পরিষদের মতো সিটি করপোরেশনও দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে গত বছরের নভেম্বরে সরকার আইন সংশোধন করে। সংশোধিত আইনে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগেই দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হলেও নাসিক নির্বাচন দিয়ে শুরু হলো দলীয় ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দলীয় ভিত্তিতে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গেলেও ওই নির্বাচনে দলটির তেমন আন্তরিকতা দেখা যায়নি। তবে নাসিক নির্বাচনকে দলটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এজন্য সজ্জন হিসেবে পরিচিতি ও আলোচিত সেভেন মার্ডার মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেনকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।
এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও এই নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এ জন্য তৃণমূল থেকে ভিন্ন কাউকে দলের মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করলেও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ তা আমলে নেয়নি। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জরিপ ও মাঠ যাচাই করে জনপ্রিয়তার বিবেচনায় বর্তমান মেয়র ড. সেলিনা হায়াৎ আইভীকেই দল থেকে মনোনয়ন দিয়েছে। একইসঙ্গে তার পক্ষে কাজ করার জন্য দলীয় প্রধান নারায়ণগঞ্জের নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগও তাদের দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে একাধিক টিম গঠন করে নির্বাচনি প্রচারণার দায়িত্ব দিয়েছে। এছাড়া মনিটরিং টিম গঠন করে তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে।
দুই দলেরই কেন্দ্রীয় নেতারা নিজ-নিজ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে গত ৩ সপ্তাহ ধরেই ঢাকা ছেড়ে নারায়ণগঞ্জে স্থায়ী আসন গেড়ে ছিলেন। দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করতে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নাসিক এলাকার অলি-গলি চষে বেড়িয়েছেন তারা। ভোটারদের দ্বারে-দ্বারে গিয়ে তারা ভোট চেয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন ছাড়া শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশ নিয়মিতভাবে নারায়ণগঞ্জে গিয়েছেন। পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের প্রধানরা গেছেন ধানের শীষের ভোট চাইতে।
এদিকে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও এমপিরা নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিতে না পারলেও অন্যরা ঠিকই মাঠে ছিলেন। সরকারে পদ-পদবি নেই, এমন সব নেতাই নিয়মিত নারায়ণগঞ্জে গিয়ে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। এর বাইরে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারাও একধিক টিম করে গোটা নারায়ণগঞ্জ সিটি এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। সব মিলিয়ে দুই দলের ডামাঢোলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন যেন জাতীয় নির্বাচনে রূপ নিয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীও নির্বাচনি প্রচারণাকালে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশের পাশাপাশি জয়েরও আশা প্রকাশ করেছেন। মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে যেতে পারে, সেই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষের প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।’
বিএনপির মেয়র প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট। এ পরিস্থিতি যদি বহাল থাকে, তাহলে ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত।’
সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটাররা নীরব ভোট বিপ্লব ঘটাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জের অধিবাসী এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা জুলুম, নির্যাতন, গুম, খুন, হামলা, মামলা, হয়রানি, দখল, দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসসহ নানা ধরনের অন্যায়ের শিকার। আপনাদের এক-একটি ভোট হবে এসবের বিরুদ্ধে এক-একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। ’
এদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত সেলিনা হায়াৎ আইভীও জয়ের বিষয়ে আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ ও সুন্দর রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেভাবে তৎপর রাখার কথা নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, সেভাবে যেন করা হয়।’
নৌকার প্রার্থীই জিতবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইলেকশন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হলে নৌকাই বিজয়ী হবে, ইনশাআল্লাহ। আমাদের পার্টি এখন ঐক্যবদ্ধ। ঐক্যবদ্ধভাবেই এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পালে হাওয়া লেগেছে।’
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ইসিকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্বাধীন ও কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ যাকে খুশি, তাকে ভোট দেবে। এটাই আমরা চাই। এটাই আমাদের নেত্রীর নির্দেশ।’
নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। গত ৫ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা নারায়ণগঞ্জে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে চাই।’
ভোটাররা যেন শঙ্কামুক্তভাবে ভোট দিতে পারে, তার সব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে এই কমিশনার বলেন, ‘আমরা কোনও ধরনের গোলমাল ও অনিয়ম সহ্য করব না। নিঃসংকোচে সবাই যেন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, আমরা সেই ব্যবস্থা করেছি। ভোটারদের আহ্বান জানাই-আপনার ভীত হবেন না, নির্বিঘ্নে ভোট দিতে আসবেন।’
/এমএনএইচ/








