মানিকগঞ্জের নব নির্বাচিত পৌরমেয়র মুক্তিযোদ্ধা গাজী কামরুল হুদা সেলিম প্রথমে নিজেকে, এরপর কাউন্সলির ও পৌরসভার স্টাফদের দুর্নীতিমুক্ত রেখে কাজ শুরু করতে চান। তিনি বলেন, সরকারি কোনও সংস্থার অডিটর দিয়ে পৌরসভা অডিট করেই আমি দায়িত্ব নিতে চাই। দুর্নীতির সঙ্গে কোনও আপস নেই।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে ৪২ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে মানিকগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হয়। ১৯৯৭ সালে মানিকগঞ্জ পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে দুই লাখের ওপরে জনসংখ্যার মধ্যে মোট পৌরভোটার সংখ্যা হচ্ছে ৪৯ হাজার ৪৩২ জন। মানিকগঞ্জ পৌরসভার পরপর তিনবারের নির্বাচিত সদ্যবিদায়ী মেয়র রমজান আলীকে ৩ হাজার ৫৬৩ ভোটের ব্যাবধানে পরাজিত করে মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গাজী কামরুল হুদা সেলিম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। পৌর এলাকার উন্নয়নে তার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হন মানিকগঞ্জ পৌরসভার সদ্য নির্বাচিত এ মেয়র।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রথমেই আপনি কোন কাজটি দিয়ে যাত্রা শুরু করবেন?
গাজী কামরুল হুদা সেলিম: মানিকগঞ্জের সবার মুখে-মুখে একটি কথা—পৌরসভাটি দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে, দুর্নীতে কে করেন, ১. মেয়র, ২. কাউন্সিলর, সব শেষে স্টাফরা। দুর্নীতি কি জনগণ করে? আমি এটা বিশ্লেষণ করে ফেলেছি। আমি আপনার মাধ্যমে স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি দুর্নীতিমুক্ত থাকব। কাউন্সিলরদেরও দুর্নীতি মুক্ত রাখলে স্টাফরাও দুর্নীতি মুক্ত থাকতে পারবেন। নামাজ পড়তে গেলে প্রথমে ওজু করতে হয়। ওজুর মাধ্যমে নিজেকে আগে পবিত্র করতে হয়। ঠিক পৌরসভাকে সঠিকভাবে চালাতে হলে আগে নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা ছাড়া কোনও উপায় নেই। ‘আমি ডু অর ডাই নীতিতে বিশ্বাসী’। অপশক্তির হাত থেকে পৌরবাসীকে মুক্ত করতে নির্বাচনের মাঠে নেমেছিলাম। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করতে রায় দিয়ে আমাকে জয়ী করেছেন ভোটাররা। তাদের কাছে দেওয়া ওয়াদা অবশ্যই পূরণ করব।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার কাজের পরিকল্পনা সংক্ষেপে জানান।
গাজী কামরুল হুদা সেলিম: নির্বাচনের আগে আমিও প্রথমে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করি। ২৭ দফা ইশতেহার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখেই আমি কাজ করব। বর্তমানে নগর ভবনকেন্দ্রিক সব ধরনের দুর্নীতির মূল-উৎপাটন করে বিগত দিনের দুর্নীতির তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেব। মানিকগঞ্জ শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খালই হচ্ছে শহরের প্রাণ ও শহরের ঐতিহ্যের প্রতীক। বর্তমানে প্রায় মৃত এই খালটির সৌন্দর্য্য বর্ধন ও উন্নয়নে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত পানি ব্যবস্থা, যানজটের নাকাল পৌরবাসীর জন্য বিকল্প রাস্তা নির্মাণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ, ঢাকার সঙ্গে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনে অগ্রাধীকার দেব।
হতদরিদ্রদের পৌরকর মওকুফ, বৈষম্যমূলক পৌরকর বাতিল করে যুক্তিসঙ্গত মাত্রায় ধার্য করব। উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্টান স্থাপন ও শিক্ষা বৃত্তি চাল করব, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কমিউিনিটি পুলিশ প্রতিষ্ঠা, পৌরপাঠাগার, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ওয়াই-ফাই জোন স্থাপন, সুইপারদের কলোনির উন্নয়ন করব।
বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচনের দিন জাল ভোট প্রদান ও কেন্দ্র দখল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, আপনি ৬৪ বছর বয়সে তা প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করেছেন। আপনার এই মানসিক শক্তির উৎস কী?
গাজী কামরুল হুদা সেলিম: আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সম্মুখ যুদ্ধের সৈনিক। সারাজীবন খেলাধুলা করেছি। তাই লড়াই করেই জয় ছিনিয়ে নিতে জানি। আমার সম্পদ অন্য কেউ লুটে নেবে আর আমি চুপ করে বসে থাকব, তা হয় না। নিজের মানসিক শক্তি আর মানুষের ভালোবাসা থাকাতেই আমি জাল ভোট ও কেন্দ্র দখলের প্রতিরোধ করতে এগিয়ে গেছি। আমি রাজনীতি শুরু করেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হাত ধরে, ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিন, আমি তখন বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে সে ভাষণ শুনেছি। আমার নীতি ও আদর্শ বঙ্গবন্ধু থেকে শেখা। মহান এ নেতা বুঝতে পারতেন, জনগণ কী চায়? তেমনিভাবে আমিও বুঝতে পেরেছিলাম, মানিকগঞ্জবাসী কী চায়। তারা পরিবর্তন চায়। সেই পরিবর্তনের জন্য আমি দীর্ঘ দিন কাজ করেছি, তাই আমি পৌরবাসীর কাছে জনপ্রিয় বিধায় তারা আমাকে ছেড়ে না গিয়ে কেন্দ্র দখলে প্রতিরোধের সঙ্গে ছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার পৌর এলাকার প্রধান সমস্যাগুলো কী?
গাজী কামরুল হুদা সেলিম: অন্তহীন সমস্যায় জর্জরিত পৌরসভাটি। অধিকাংশ এলাকা বিশুদ্ধ পানির আওতার বাইরে, অভাব, গ্যাস নেই। কোনও এলাকায় পাকা রাস্তাঘাট নেই। লোকজন পৌরট্যাক্স দেয়, কিন্তু এখনও পৌরসভার অনেক জায়গায় বিদ্যুতের আলো জলেনি। শহরে শিশুপার্ক নেই। গ্রাম ভিত্তিক সমস্যা আছে ।
বাংলা ট্রিবিউন: সমস্যাগুলোর সমাধান কিভাবে করবেন?
গাজী কামরুল হুদা সেলিম: সমাধান করা সম্ভব, আমি হতাশ হয় না। আমি আশাবাদী। তবে সব সমস্যার সমাধান একবারে সম্ভব না। বড় বড় সমস্যার সমাধান অবশ্যেই হবে। আপনি হয়ত বলতে পারেন, সেলিম ভাই কি জাদু জানেন, না কি? না আমি জাদু জানি না, তবে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান পর্যায়ক্রমে সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করলেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, এখন কি আপনার দলে ফিরে যাবেন?
গাজী কামরুল হুদা সেলিম: কোন দল কিংবা প্রতীকের বিরুদ্ধে নির্বাচন করিনি, অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমার রক্তের মধ্যে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা থেকে নিয়েই আমি আমার ১ম বার মেয়র নির্বচিত হয়েছি। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বাইরে থাকার প্রশ্নই আসে না। ২০০৩ সালে আমি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করি। ১২ বছর আমি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ে জেলার সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর সহযোগিতায় ৩৫ বছর পর মানিকগঞ্জে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন পেয়েছে।
বছরের দলীয় কাউন্সিলে শুধু একটি পদে নির্বাচন দিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক আমাকে সড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জানতাম, পৌর নির্বাচনে দল আমাকে সমর্থন কিংবা মনোনয়ন দেবে না। এ কারণে আমি আগে থেকেই পৌর নাগরিক কল্যাণ সমিতির ব্যানারে নানা নাগরিক সমস্যা সমাধানে আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেছি। ভোটাররা আমাকে পাশে পেয়ে, আমার প্রতি আস্থাশীল হয়ে ভোট দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করেছে। দল যদি মনে করে, একজন ত্যাগী নেতার দরকার, আমি ফিরে যেতে সর্বদা প্রস্তুত।
বাংলা ট্রিবিউন : পৌর উন্নয়ন ও নির্মান কাজে আপনার তদারকির ক্ষেত্রে মেয়র হিসেবে আপনার কতটুকু দায়বদ্ধতা থাকবে এবং প্রতিবছর উন্নয়নের নামে যে বাজেট বরাদ্ধ হয়, তা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে? রাস্তাঘাট নির্মাণের পর বছর ঘুরতেই খানাখন্দে পরিণত হয় কেন বলে মনে করেন?
গাজী কামরুল হুদা সেলিম: আমি শুরুতে বলেছি, আমি নিজেকে স্বচ্ছ রাখব। উন্নয়ন কাজে অনিয়মে আমি জিরো টলারেন্স নীতিতে চলব। উন্নয়নে যে টাকা বাজেট বরাদ্দ হবে, তার শতভাগ বাস্তবায়ন করব, পাশাপাশি কাজের গুণগত মানের কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। নিজে সারাজীবন সৎ থেকেছি। নিয়ত আছে বাকি সময়টুকু এর কোনও ব্যতিক্রম হবে না।
/এমএনএইচ/








