বৈশাখী উৎসব বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত: সংস্কৃতিমন্ত্রী

তানভীর হাসান
০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৩৬আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৫৬

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। মাগুরা-২ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে আইন পেশায় যুক্ত হন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন সময় শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া মন্ত্রীর মর্যাদায় মাগুরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সম্প্রতি তিনি বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তানভীর হাসানের কাছে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: হেফাজতে ইসলামসহ কিছু সংগঠন বৈশাখী শোভাযাত্রা নিয়ে বিরোধীতা শুরু করেছে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

নিতাই রায় চৌধুরী: আমি আগেই বলেছি— এটি বৈশাখী শোভাযাত্রা। এটি হলো আনন্দের শোভাযাত্রা। আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

আমাদের এখানে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” এবং “আনন্দ শোভাযাত্রা”—এই দুই নাম নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই উৎসব বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

১৯৮৯ সালে চারুকলা থেকে প্রথম “আনন্দ শোভাযাত্রা” শুরু হয় এবং এটি চলতে থাকে। পরে ১৯৯৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এটিকে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” নাম দেওয়া হয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আবার নাম পরিবর্তন হয়েছে।

কিন্তু পহেলা বৈশাখের উৎসব তার চেয়েও অনেক পুরোনো—হাজার বছরের গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজের সঙ্গে এর সম্পর্ক। তখন নগর সভ্যতা গড়ে ওঠেনি, কিন্তু কৃষক সমাজ এই উৎসব পালন করত।

বর্তমানে নাম নিয়ে দুই ধরনের গোষ্ঠী টানাপোড়েন করছে— একদিকে মৌলবাদী গোষ্ঠী, অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী। আমরা এই বিভাজনে যেতে চাই না।

আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি—এটি হবে “বৈশাখী শোভাযাত্রা” । এটি সরকারের সিদ্ধান্ত, এবং আমরা সেটি ঘোষণা করেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: স্কুলগুলোতে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েও হেফাজতে ইসলামসহ কিছু সংগঠন বলছে ধর্মীয় শিক্ষক বাড়ানো উচিত। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

নিতাই রায় চৌধুরী: তারা তাদের মতামত দিতে পারে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে কথা বলছি। আমরা একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার, জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।

সংগীত নিয়ে বিরোধিতা কেন হবে—এটা আমার কাছে প্রশ্ন? সংগীত আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মানুষের মনন, মূল্যবোধ এবং সৃজনশীলতা গড়ে তোলে।

কেউ যদি বলে ধর্মীয় শিক্ষক বাড়াতে হবে—সে তার মতামত দিতে পারে। কিন্তু আমরা মনে করি শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কৃতির জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি। সংগীত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ডিজিটাল যুগে বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় আপনার মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

নিতাই রায় চৌধুরী: এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া—একটি ইন্টারভিউতে পুরোটা বলা সম্ভব নয়। তবে সংক্ষেপে বলছি—আমরা বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে তুলে ধরবো।

আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এবং চারুকলার মাধ্যমে পুরনো ঐতিহ্য ও নিদর্শন উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হবে। সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মা—এটি মানুষের ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধকে ধারণ করে। আমাদের সংগীতে বাউল, মারফতি, মুর্শিদি, কীর্তন—এমন বহু ধারার ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা এগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেব।

যাত্রা, নাটক—এসব থাকবে, তবে এগুলোকে জীবনমুখীভাবে উপস্থাপন করা হবে। আমাদের লক্ষ্য—সংস্কৃতিকে স্কুল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে—এ বিষয়ে কী করবেন?

নিতাই রায় চৌধুরী: আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছি। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাংলাদেশের ৪৪টি দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে—এটি আমাদের কালচারাল ডিপ্লোমেসির অংশ। এর মাধ্যমে আমরা যেমন অন্য দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবো, তেমনি আমাদের সংস্কৃতিও বিশ্বে তুলে ধরবো। আমরা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য চাই। সমাজে বিভাজন নয়, ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য।

বাংলা ট্রিবিউন: শিল্পীরা অভিযোগ করেন তারা যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা পান না। এ বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

নিতাই রায় চৌধুরী: এ বিষয়ে আমাদের বিস্তৃত পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা যেমন পুরোহিত, ইমাম-মুফতি এবং অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছি, তেমনি শিল্পীদের জন্যও সহায়তার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আমরা চাই, সংস্কৃতি একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। যারা সংগীত, নাটক, যাত্রা বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত—তারা যেন এটি পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে এবং তার মূল্য পায়।

সারাদেশের শিল্পকলা একাডেমিগুলোকে সক্রিয় করা হবে। সেখানে বাউল, লালন, উচ্চাঙ্গ, রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিকসহ বিভিন্ন ধারার সংগীতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়া হবে, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রুটিনভিত্তিকভাবে যুক্ত করা হবে, যাতে পড়াশোনার পাশাপাশি তারা সাংস্কৃতিক চর্চা করতে পারে।

গ্রাম পর্যায়ে লোকসংগীতের চর্চা জোরদার করা হবে। প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে। ধীরে ধীরে এটি একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেবে।

আমাদের লক্ষ্য—দেশজুড়ে সংস্কৃতির চর্চা বিস্তৃত করা, নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা, এবং একটি সৃজনশীল, মানবিক ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা।

বাংলা ট্রিবিউন: সারাদেশে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সেখানে যে পরিমাণে শিল্পচর্চা হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। বিভিন্ন কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে কার্যকরভাবে সাংস্কৃতিক চর্চা গড়ে ওঠেনি।

নিতাই রায় চৌধুরী: তবে আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এখন থেকে এটি পরিবর্তন হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: কীভাবে হবে?

নিতাই রায় চৌধুরী: আমরা ইতোমধ্যে একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিচ্ছি। আমাদের শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে সংগীতের বিভিন্ন বিভাগ চালু থাকবে। যেমন—বাউল সংগীত, লালন সংগীত, উচ্চাঙ্গ সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি এবং আধুনিক সংগীত—প্রতিটি ধারার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে।

এই প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। সমাজে অনেক গুণী শিল্পী আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে শিখেছেন কিন্তু যথাযথ মূল্যায়ন পাননি—আমরা তাদেরকে এই ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসবো।

তারা একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে—“সা রে গা মা”—শুরু করে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেবেন। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা এতে অংশগ্রহণ করবে, এবং শিক্ষকদের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদেরও সম্মানী প্রদান করা হবে।

আমরা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদেরও অন্তর্ভুক্ত করবো—যারা তবলা, এসরাজসহ বিভিন্ন যন্ত্র বাজান, তাদেরও সম্মানী দেওয়া হবে। পাশাপাশি নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে, যাতে আগ্রহ ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

বাংলা ট্রিবিউন: শিক্ষাথীদের এইসব কর্মকান্ডের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত করা হবে?

নিতাই রায় চৌধুরী:  এ বিষয়ে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করেছি। উপজেলা পর্যায়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি রুটিন তৈরি করা হবে। নির্ধারিত দিনে শিক্ষার্থীরা শিল্পকলা একাডেমিতে এসে প্রশিক্ষণে অংশ নেবে।

নাচ, নাটক ও সংগীত—সব ক্ষেত্রেই এই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া যারা পল্লীসংগীত ও লোকসংগীতে দক্ষ, তারা গ্রাম পর্যায়ে কাজ করবে। তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা ছড়িয়ে দেবে। পুরো কার্যক্রমটি এমনভাবে পরিচালিত হবে যাতে শিক্ষার্থীদের মূল পড়াশোনার কোনো ক্ষতি না হয়।

সংস্কৃতি একটি বিশাল ক্ষেত্র—তাই আমরা ধাপে ধাপে এগোবো। শুরুতে এই কার্যক্রম চালু করে শিক্ষার্থীদের সঠিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করা হবে।

পরবর্তী সময়ে জেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে আরও বিস্তৃত সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। সেখান থেকে প্রশিক্ষিত শিল্পীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে কাজ করবে। আমাদের লক্ষ্য—সারা দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করা, এবং গানে-নাটকে-সংস্কৃতিতে দেশকে প্রাণবন্ত করে তোলা।

/এম/  
সম্পর্কিত
একান্ত সাক্ষাৎকারে মাহমুদুর রহমান মান্নাসরকারকে আরও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এগোতে হবে
১ আগস্টের আগেই খুলছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর 
সংসদে সুস্থ ধারার রাজনীতির সুবাস ছড়াতে চাই: নুসরাত তাবাসসুম
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম