সুইসাইডাল ভেস্ট—দেখতে ফতুয়া বা হাতা কাটা গেঞ্জির মতো এক ধরনের পোশাক। যা জঙ্গি-সন্ত্রাসী আত্মঘাতী হামলা চালাতে ব্যবহার করে। আত্মঘাতী হামলা চালানোর সব ধরনের উপকরণ থাকে এই সুইসাইডাল ভেস্ট নামের পোশাকের মধ্যে। শনিবার দুপুরে আশকোনা জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানের সময় সুইসাইডাল ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটায় আত্মঘাতী নারী জঙ্গি শাকিরা। বাংলাদেশে এই প্রথম কোনও নারী জঙ্গি সুইসাইডাল ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটালো। তবে এর আগে আরও কয়েকটি জঙ্গি আস্তানা থেকে কয়েকটি সুইসাইডাল ভেস্ট উদ্ধার করেছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
আশকোনার জঙ্গি আস্তানাটি শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার পরপরই চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সদস্যরা। শুরু থেকেই জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের জন্য হ্যান্ড মাইক দিয়ে বারবার অনুরোধ জানাতে থাকেন সিটিটিসির কর্মকর্তারা। কিন্তু তারা আত্মসমর্পণ না করে উল্টো ভেতর থেকে পুলিশকে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এ সময় বিস্ফোরণ ঘটানোর হুমকিও দেয় জঙ্গিরা।
সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, শুরু থেকেই বাড়ির ভেতরে থাকা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। প্রথমে তারা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরইমধ্যে মিরপুরের রূপনগরের অভিযানে নিহত জঙ্গি মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলার মা ও ভাইকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যায় পুলিশ। শিলার মা হ্যান্ড মাইকে মেয়েকে বেরিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানাতে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ অনুরোধ জানানোর পর বেলা ১১টার দিকে আস্তানা থেকে শিশু সন্তান নিয়ে বেরিয়ে আসে শিলা। তার সঙ্গে পলাতক আরেক জঙ্গি মুসার স্ত্রী তৃষাও তার শিশু সন্তান নিয়ে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসার পর তাদের কাছ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র ও একটি চাকু উদ্ধার করেন সিটিটিসির সদস্যরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আস্তানার মধ্যে তিনটি শিশুসহ সাতজন ছিল। তাদের মধ্যে দুই শিশুকে নিয়ে দুই নারী জঙ্গি আত্মসমর্পণ করে। এ ঘটনার পর চার বছরের এক শিশুকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এক তরুণ ও এক নারীর মৃতদেহ ভবনের ভেতরে পড়ে আছে। ওই বাসায় যেসব বিস্ফোরক ছিল, সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হবে।
নিহত দুই জনের একজন আজিমপুরে নিহত জঙ্গি তানভীর কাদেরী ওরফে আবুদল করিমের যমজ ছেলের একজন। তানভীর কাদেরীর আরেক ছেলে আজিমপুরে অভিযানের সময় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। নিহত অন্য নারী জঙ্গি হচ্ছে শাকিরা। তার স্বামী জঙ্গি সুমন। তবে এই সুমনের কোনও তথ্য পুলিশের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ধারণা করা হচ্ছে, এটি তার সাংগঠনিক নাম। আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সুমনের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করবে পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আতসমর্পণের আহ্বান জানানোর এক পর্যায়ে হঠাৎ সুমনের স্ত্রী শাকিরা শিশু সন্তানসহ বেরিয়ে আসার কথা জানায়। এ সময় তার গায়ে সুইসাইডাল ভেস্ট বাঁধা ছিল। ভেস্টের মধ্যে তাজা গ্রেনেডও রক্ষিত ছিল। পুলিশ তাকে ওই ভেস্ট খুলে আসার জন্য বলে। কিন্তু শাকিরা ভেতরে গিয়ে আবার বেরিয়ে আসে। এক পর্যায়ে সুইসাইডাল ভেস্টের সুইচ টিপ দিয়ে সেটার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সঙ্গে থাকা শিশুটি গুরুতর আহত হয়। দ্রুত পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। বাংলাদেশে এই প্রথম কোনও জঙ্গি সুইসাইডাল ভেস্ট দিয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ভেতরে আরও দুই-তিনটি সুইডাইডাল ভেস্ট থাকতে পারে বলেও সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ধারণা।
এর আগে গত বছর ডিসেম্বরে মিরপুরের একটি জঙ্গি আস্তানা থেকে কয়েকটি সুইসাইডাল ভেস্ট উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এছাড়া চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঘাঁটি বানৌজা ঈসা খানের ভেতরে বানৌজা পতেঙ্গা মসজিদে বিস্ফোরণের পর আটক আবদুল মান্নানের কাছ থেকে বোমাসহ কয়েকটি সুইসাইডাল ভেস্ট উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে শনিবার বিকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আশকোনার বাসাটি ভাড়া করেছিল পলাতক জঙ্গি মাইন উদ্দিন ওরফে মুসার স্ত্রী। সেখানে মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা ও শিশু কন্যাও ছিল। দুই শিশু কন্যাসহ দুই নারী বেরিয়ে আসার পরও ভেতরে তিনজন থেকে গিয়েছিল। ওই তিন জনের মধ্যেও ছিল একজন শিশু। তারা কিছুতেই আত্মসমর্পণ করছিল না। ভেতরে থাকা অন্য তিনজনকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাতে থাকেন অভিযানে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা। কিন্তু তারা কিছুতেই আত্মসমর্পণ করতে রাজি হননি। এরপর পুলিশ অভিযানের সময় দু’জন নিহত ও একজন আহত হয়েছে।
আরও পড়ুন: আশকোনা অপারেশনের নাম ‘রিপল ২৪’
/এমএনএইচ/








