ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের কাছ থেকে রাজধানীর সাতটি ‘অনস্ট্রিট পার্কিং’ বুঝে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত ফি আদায় নিয়ে শুরুতেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ডিএসসিসি’র কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।
ডিএসসিসি’র প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার দাবি, সারাদিন যদি কেউ গাড়ি পার্কিং করে রাখে, তাহলে নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া হয়। এছাড়া, এমন হওয়ার কথা না। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘পোষায় না’ এমন অজুহাতে ডিএসসিসি’র কর্মীরা নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করছেন।
২০ ডিসেম্বর ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানজট নিরসনে পকেট বা স্ট্রিট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করে। মোট ৫৩টি স্পটে এমন পার্কিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে সাতটি স্ট্রিট পার্কিং বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে- শিল্প ব্যাংক ভবন থেকে মতিঝিল আলিকো বিল্ডিং পর্যন্ত রাস্তার এক পাশ, স্বর্ণ মার্কেট থেকে রিং রোডের এক পাশ, নয়া পল্টনের পলওয়েল মার্কেটের সামনে, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে নেভি কল্যাণ ফাউন্ডেশন পর্যন্ত রাস্তার এক পাশ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের রাস্তার উভয় পাশ, এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যাল থেকে গাউছিয়া মার্কেট পর্যন্ত এক পাশ এবং পলাশী থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত। এই সাতটি পার্কিং-এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে ডিএসসিসি। এই পার্কিংগুলো থেকে সাময়িক বিভাগীয় খাস বা ফি আদায়ের অফিস আদেশ জারি করেছে ডিএসসিসি’র সম্পত্তি বিভাগ। আদেশে বলা হয়েছে, প্রতিটি গাড়ি থেকে (জিপ/কার/মিনিবাস/বেবি ট্যাক্সি/মাইক্রোবাস/সিএনজিচালিত অটোরিকশা/ পিকআপ ভ্যান/ মোটরসাইকেল থেকে ১৫ টাকা হারে পার্কিং ফি আদায় করা হবে। এসব পার্কিংয়ে দায়িত্ব পালন করছেন সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। তারাই গাড়ি পার্কিংয়ের ফি আদায় করেন। তাদের কেউ কেউ ‘পোষায় না’ বলে অতিরিক্ত ফি নিচ্ছেন। গাড়ির মালিক ও চালকরাও জানেন না আসলে নির্ধারিত ফি কত।
ডিএসসিসি নিয়ন্ত্রিত পার্কিংগুলোর সেবাদান প্রক্রিয়া দেখতে গত বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে পলওয়েল মার্কেটেরর সামনে যান বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদক। এ সময় দেখা যায়, মার্কেটের সামনে সারিবদ্ধভাবে ২৪টি প্রাইভেট কার পার্কিং করে রাখা হয়েছে। তিনটি গাড়ি রাস্তার মাঝখানে পার্কিং করা। যদিও এখানে পার্কিং করার কথা ১৮টি গাড়ির। রাস্তার আই লাইনে দাঁড়িয়ে ডিএসসিসি’র লোগো লাগানো বিশেষ পোশাক পড়ে এক ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানে আসা গাড়িগুলোকে রিসিট দিয়ে টাকা নিচ্ছেন। সামনে গিয়ে দেখা গেলো, একটি মাইক্রোবাসের চালকের কাছ থেকে তিনি ৩০ টাকা নিয়েছেন। মাইক্রোবাসটি আরোহীদের নিয়ে চলে যাওয়ার পর জানতে চাইলে ডিএসসিসি’র কর্মী জানান, তার নাম দিলিশলাম। তিনি ডিএসসিসি’র সম্পত্তি বিভাগের কর্মী। পার্কিং ফি কত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৫ টাকা।’ তাহলে মাইক্রোবাসের চালকের কাছ থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হলো কেন? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘সব সময় ১৫ টাকাই নেই। মাঝে মাঝে ৩০ টাকা নেই। আবার যেসব গাড়ি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলো থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হয়।’ মাইক্রোবাসটি অল্প সময় থাকার পরও তার চালকের কাছ থেকে ৩০ টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে ডিএসসিসি’র এই কর্মী কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি।
ফি সংগ্রহের দাত্বে থাকা এই কর্মী বলেন, ‘সব সময় ৩০ টাকা নেই না, মাঝে মাঝে নেই। তাছাড়া, এখানে সব প্রশাসনের গাড়ি আসে। তাদের কাছ থেকে কোনও টাকা নেওয়া হয় না। এখানে প্রতিদিন ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকার বেশি ওঠে না।’
বাটা সিগন্যাল থেকে গাউছিয়া, পলাশী, দিলকুশা রাস্তার স্ট্রিট পার্কিয়েও দেখা গেছে এমন দৃশ্য। দিলকুশায় দুলাল নামে এক ব্যক্তিকে টাকা উঠাতে দেখা গেছে। শাহজালাল নামে একজন প্রাইভেট কার থেকে ৬০ টাকা নিয়েছেন। জানতে চাইলে চালক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি কিছু জানি না। আমার বস ব্যাংকে এসেছিলেন আড়াই ঘণ্টা হবে। এজন্য ৬০ টাকা নিয়েছে।’
তাৎক্ষণিক এ বিষয়টি ডিএসসিসি’র কর্মী দুলালের কাছে জানতে চাইলে তিনি হেসে হেসে বলেন, ‘অনেকক্ষণ ছিল। তাই ৬০ টাকা রাখা হয়েছে।’ তবে এ সময় তার হাতে থাকা রিসিটের অংশ দেখতে চাইলে, তিনি তা দেখাননি। কত টাকা তিনি লিখেছেন তাও বলেননি।
রাজধানীর যানজট নিরসনে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য অস্থায়ীভাবে গত ২০ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ৫৩টি জায়গা নির্ধারণ করে। এর সাতটি ডিএসসিসি-কে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কারণ, সড়কের মালিক ডিএসসিসি। ফি আদায় করলে তারাই করবে। ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের (দক্ষিণ) যুগ্ম-কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে স্ট্রিট পার্কিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের (দক্ষিণ) যুগ্ম-কমিশনার বলেন, ‘পার্কিংয়ের জন্য অস্থায়ীভাবে ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের পূর্ব, দক্ষিণ, উত্তর ও পশ্চিম বিভাগের রাস্তার পাশে খোলা জায়গাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। কোন পার্কিংয়ে কতটি গাড়ি পার্ক করা যাবে তাও নির্ধারণ করে দিয়েছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ। সাতটি পার্কিং পয়েন্ট ডিএসসিসি বুঝে নিয়েছে। তারা দেখভাল করছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করবো।’
স্ট্রিট পার্কিং থেকে নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের বিষয়ে ডিএসসিসি’র প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তিনি বলেন, ‘অল্প সময়ের জন্য যদি কেউ গাড়ি পার্কিং করে তাহলে ১৫ টাকা করে রাখা হবে। যদি বেশি সময় ধরে কেউ রাখে তাহলে ফি বাড়বে। অনেকে সারাদিনের জন্য গাড়ি পার্কিং করে রাখেন, তাদেরকে প্রতি ঘণ্টায় ১৫ টাকা হারে ফি দিতে হবে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, যে কোনও গাড়ি পার্কিং করলেই ৩০ টাকা করে রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএসসিসি’র এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ রকম অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে।’








