শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক ড. আব্দুল হালিম প্রামাণিককে (সম্রাট) বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে তিরস্কার ও পরবর্তী পদন্নোতি নির্ধারিত সময়ের চেয়েও দুই বছর বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে ইতোমধ্যে রিভিউ আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা। যৌন হয়রানির মতো গুরু অপরাধে লঘু দণ্ডের সমালোচনা করে আইন বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, একইসময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্রকাশনা জালিয়াতি’র অভিযোগে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাসির উদ্দিন আহমেদকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অথচ যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও অভিযুক্তের শাস্তি কেবল ‘তিরস্কার’-এর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। এ বিষয়ে জবি উপাচার্য মীজানুর রহমান বলছেন, ‘ঘটনা প্রমাণের জন্য সিন্ডিকেট এই শাস্তি নির্ধারণ করেছে, তা নয়। অভিযোগ আসার ভিত্তিতেই এই শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিষয়টা এমন না যে, ঘটনা ঘটেছে, এমনটা ধরে নিয়েই বিচার হয়েছে।’
অভিযোগ প্রমাণের পরও এ ধরনের লঘুদণ্ডে বিস্ময় প্রকাশ করে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের একজন বলেন, ‘এই শিক্ষক জানেন, কারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগগুলো প্রমাণিতও হয়েছে। এখন যদি তিনি বিভাগেই থেকে যান, তাহলে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা শঙ্কার মধ্যে পড়ে যান। আর এটি ফৌজদারি অপরাধ। বাইরে মামলা না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রতিকার চেয়ে কি তাহলে আমরা ভুল করলাম?’
প্রাথমিক তদন্ত কমিটির প্রধান গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়্যারম্যান হেলেনা ফেরদৌসী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যে তদন্ত করেছি, তাতে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। আমরা উপাচার্যের কাছে এই বিষয়ে প্রতিবেদনও জমা দিয়েছি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় আরেকটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি করে। তাদের সুপারিশে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি এখন ছুটিতে আছি। কিন্তু ছুটির আগেই আব্দুল হালিম প্রামাণিকের বিষয়ে তদন্তের বিপোর্ট জমা দিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তদন্তে তিনি দোষী প্রমাণিত হয়েছিলেন। সেভাবেই রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল।’
যৌন হয়রানির মতো একটি গুরুতর অপরাধের জন্য কেবল তিরস্কার ও পদোন্নতি বিলম্বিত করার মতো শাস্তি যথোপযুক্ত কিনা, জানতে চাইলে হেলেনা ফেরদৌসী বলনে, ‘আমি খুব স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এবং দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও যদি বলি, তাহলে আমি মনে করি, এত গুরুতর অপরাধের শাস্তি এটা হতে পারে না। তিরস্কার করা ও প্রমোশন দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া অপরাধের তুলনায় কিছুই নয়। এই অপরাধের শাস্তি আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সভাপতি কামালুদ্দিন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সাতজন সদস্য ছিলেন। সেখানে নিয়মানুযায়ী নারী সদস্য বেশি ছিলেন।বিভাগীয় সহকর্মী হিসেবে আমরাও গিয়েছি।সেখানে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ওই তদন্ত কমিটির প্রধানের বক্তব্যও আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল সরাসরি প্রতিষ্ঠানটির এই ‘তিরস্কার’ করার সিদ্ধান্তটি কীভাবে এলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে চাইতে পারি, কোন নীতিমালায় তাকে এই শাস্তি দেওয়া হলো? এই ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য তিরস্কার পাবেন, সেটা কোন প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? প্রতিষ্ঠান কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলো, একে তিরস্কার করলেই হয়ে যাবে। তার মানে বিধিমালা আছে তাদের? যদি থেকে থাকে, তাহলে বিধিমালায় কী লেখা আছে? সে রকম করলেই হয়। ফৌজদারি অপরাধে নির্দিষ্ট করা থাকে কোন অপরাধে কী শাস্তি, তারা কি তেমন কিছু মেনে করলো? আমরা তাদের কাছে এটা জানতে চাই।’
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের যে নিয়মনীতি, তা মেনে চলার চলছে না। যৌন হয়রানির ঘটনা তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়ার পরও তিরস্কারের যে সিদ্ধান্ত নিলো, তা হাস্যকর।সিন্ডিকেট যে এসব ঘটনাকে উসকানি দিচ্ছে, সেটারই বহিঃপ্রকাশ। তিরস্কারের সিদ্ধান্ত তাই প্রমাণ করে।’
প্রসঙ্গত, গতবছর ১৫ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) সন্ধ্যার দিকে অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে ফোন দিয়ে নিজ রুমে ডাকেন। পরে সেই শিক্ষক তাকে যৌন নিপীড়ন করেছেন বলে শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন। ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) তিনি উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ২৬ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) জাবির ৭৭তম সিন্ডিকেট সভায় ওই শিক্ষককে তিরস্কারের মধ্য দিয়ে এ ঘটনার সমাপ্তি টানে প্রশাসন।








