রাজধানীর কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের দুই বছর হতে চলছে। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রথম পাল্টা অভিযানে একসঙ্গে মারা যায় নয় জঙ্গি। যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা ‘ওয়েকআপ কল’ হিসেবে বিবেচনা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে জঙ্গিদের নিষ্ক্রিয় করতে না পারলে হলি আর্টিজানের মতো আরও ঘটনা ঘটতো। ওই আস্তানায় এমন অন্তত পাঁচ জন নিহত হয়েছিল, যারা পরবর্তী হামলার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। আস্তানা থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের পতাকা সম্বিলিত জঙ্গিদের ছবিও উদ্ধার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যা গুলশান হামলার দিবাগত মধ্য রাতে আইএসের প্রপাগান্ডা চ্যানেল আমাক এজেন্সি থেকে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে মিল রয়েছে।
কিন্তু আলোচিত এই জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ঘটনায় মিরপুর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেই মামলার তদন্তের অগ্রগতি কী? জানতে চাইলে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা তদন্তের কাজ অনেকটা গুছিয়ে এনেছি। ঘটনার সময় রাকিবুল হাসান রিগ্যান নামে জীবিত এক জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এছাড়া পরবর্তী সময়ে আরও ১১ জনকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।’
মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘অভিযানের সময় ওই আস্তানায় যারা ছিল তাদের মধ্যে একজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। একজনকে পালানোর সময় আমরা গ্রেফতার করেছিলাম। বাকি নয় জন মারা গিয়েছিল। ওই আস্তানাটি ব্যবহৃত হচ্ছিল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে। সেখানে যারা অর্থ ও অস্ত্রের যোগান দিতো, যারা প্রশিক্ষণ দিতো, যাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল, তাদের এই মামলায় অভিযুক্ত করা হবে।’
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর অনেকটা অস্বস্তিতে পড়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এরপর থেকে সমন্বিত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছরেরই ২৬ জুলাই সন্ধ্যায় কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কের জাহাজবাড়িতে অভিযান চালানো হলে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট সদস্যদের সঙ্গে গুলি বিনিময়ে ৯ জঙ্গি মারা যায়। এসময় পালিয়ে যাওয়ার সময় রাকিবুল হাসান রিগ্যান নামে একজনকে আটক করা হলেও ইকবাল নামে আরেক জঙ্গি পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাস দমন আইনে মিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে সিটিটিসি।
১২ জন গ্রেফতার, ৪ জনের স্বীকারোক্তি
কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের ওই মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার সময় রাকিবুল হাসান রিগ্যানকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদেরও এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। গ্রেফতারকৃত অপর জঙ্গি সদস্যরা হলো সালাউদ্দিন কামরান, আব্দুর রউফ প্রধান, মাওলানা আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর, আহমেদ ইমতিয়াজ অমি, আব্দুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা সোহেল, আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ ওরফে র্যাশ, হাদীসুর রহমান সাগর, আকাশ, হাবিবুল্লাহ, কবিরুল ও মিজানুর। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রিগ্যান, সালাউদ্দিন কামরান, রউফ প্রধান ও রাশেদ ওরফে র্যাশ আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেফতার দেখানোর পর হাদীসুর রহমান সাগরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন মঞ্জুর হলেও অসুস্থ থাকার কারণে সাগরকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। শিগগিরই তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এছাড়া আকাশ, হাবিবুল্লাহ, কবিরুল ও মিজানুরকে প্রথমে বাগেরহাট জেলা পুলিশ সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে প্রথমে গ্রেফতার করে। পরবর্তী সময়ে তাদের কল্যাণপুরের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তাদেরও এই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানার জঙ্গিরা হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মতোই আরেকটি হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও তারা নিয়েছিল। কিন্তু পুলিশের অভিযানের কারণে তারা সেই সুযোগ আর পায়নি।
পলাতক এখনও সাত জন
কল্যাণপুরের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় এজাহারভুক্ত সাত আসামিকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া আসামির তালিকায় নাম থাকা তামিম চৌধুরী নারায়ণগঞ্জে ও সরোয়ার জাহান মানিক আশুলিয়ায় পৃথক দুই অভিযানে নিহত হয়েছে। এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের মধ্যে ইকবাল, শরীফুল ইসলাম খালিদ, মামুনুর রশীদ রিপন, মামুন, জুনায়েদ খান, বাদল ও আসাদুল কবিরাজ এখনও পলাতক। এর মধ্যে খালিদ ও রিপন বর্তমানে ভারতে পলাতক রয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জুনায়েদ খান সিরিয়ায় আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর ফেরেনি। বাদল, আসাদুল কবিরাজ, মামুন ও ইকবালকে এখনো সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গুলশান হামলায় গ্রেফতার হওয়া রাজীব গান্ধীসহ আরও কয়েকজনের জবানবন্দিতে আসাদুল কবিরাজ ও বাদলের নাম এসেছে। কিন্তু তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এছাড়া ইকবাল ও মামুনের পরিচয় একেবারেই শনাক্ত করা যায়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিরা একেক সময় একেক সাংগঠনিক নামে পরিচিত থাকে। বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি অভিযানে নিহত হওয়াদের মধ্যে অনেকের পরিচয়ও এখনও শনাক্ত করা যায়নি। অজ্ঞাত নিহতদের মধ্যেও এরা থাকতে পারে।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমরা পলাতকদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছি। পলাতকদের শনাক্ত করতে পারলেই এই মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হবে।’
নিহত একজনের পরিচয় মেলেনি এখনও
অপারেশন স্টর্ম-২৬ নামে কল্যাণপুরে চালানো ওই অভিযানে নিহত নয় জনের মধ্যে একজনের পরিচয় এখনও পায়নি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ওই অভিযানে নিহত আটজন হলো দিনাজপুরের বল্লাহপুরের সোহরাব আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (২৩), পটুয়াখালীর কুয়াকাটার নুরুল ইসলামের ছেলে আবু হাকিম নাঈম (৩৩), ঢাকার ধানমন্ডির রবিউল হকের ছেলে তাজ-উল-হক রাশিক (২৫), গুলশানের বাসিন্দা সাইফুজ্জামান খানের ছেলে আকিফুজ্জামান (২৪), বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা তৌহিদ রৌফের ছেলে শেহজাদ রৌফ অর্ক ওরফে মরক্কো (২৪), সাতক্ষীরার ওমরপুরের নাসিরুদ্দিন সরদারের ছেলে মতিয়ার রহমান (২৪), নোয়াখালীর পশ্চিম মাইজদীর আব্দুল কাইয়ুমের ছেলে জোবায়ের হোসেন (২০) ও রংপুরের পীরগাছা থানার শাহাজাহান মিয়ার ছেলে রায়হান কবির ওরফে তারেক (২৬)। বাকি একজনের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিহত ওই যুবকের পরিচয় উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পাওয়া যায়নি।








