মাদক-জঙ্গি দমনে যত কাজ বিট পুলিশের

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ০৮:০০, জুলাই ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৯, জুলাই ২৮, ২০১৯

 

 অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করে থানা পুলিশকে সহায়তা করাই হচ্ছে বিট পুলিশের মূল কাজ। এলাকায় অপরাধী কারা, কী ধরনের অপরাধ করে থাকে, জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধ করে কিনা, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা জঙ্গিদের অপতৎরতাসহ নানামুখী অপরাধের দিকে লক্ষ রেখে, সেসব তথ্য থানাকে জানান বিট পুলিশের সদস্যরা। এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় উপাসনালয়, অফিস বা গুরুত্বপূর্ণ কোনও স্থাপনা, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা শপিং মল আছে কিনা, সেগুলোর তালিকা তৈরিও তাদের কাজ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিট পুলিশিং হচ্ছে একটি থানার ক্ষুদ্র অংশ। কাজের সুবিধার্থে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে ২০১০ সালে ঢাকা মহানগরীতে বিট পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করা হয়। এজন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সব থানা এলাকার পাড়া-মহল্লাকে বিভিন্ন বিটে ভাগ করা হয়। বর্তমানে ডিএমপিতে ৩০২টি বিট রয়েছে। একজন সাব ইনসপেক্টর (এসআই) কিংবা অ্যাসিসটেন্ট সাব ইনসপেক্টরের (এএসআই) নেতৃত্বে তিন থেকে পাঁচজন কনস্টেবল দেওয়া হয় প্রতি বিটে। সরবরাহ করা হয় ক্রাইম নোট বুক। এসব নোটবুকে অপরাধের ধরন অনুযায়ী কলাম রয়েছে। প্রতিটি কলামে অপরাধের ধরন বা ঘটনা লিখতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বিট এলাকার সব ধরনের অপরাধ কিংবা তথ্য ক্রাইম নোট বুকে লিখে সংশ্লিষ্ট থানার ডিউটি অফিসারের কাছে জমা দিতে হয়। ঘটনার গুরুত্ব অনুযায়ী ডিউটি অফিসার কিংবা থানার ওসি ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। এতে থানা পুলিশের কাজের অনেক সুবিধা হয়।

বিট পুলিশিংয়ের সুফল পেয়ে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই তার কর্ম এলাকায় এ ব্যবস্থা চালু করেছেন। এরইমধ্যে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় বিট পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করা হয়। সিলেটের ডিআইজি কামরুল আহসান বিট পুলিশিংয়ের আদলে সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত এলাকায় পুলিশিং ব্যবস্থার নতুন ধরন চালু করেন। ইউনিয়নভিত্তিক কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে পুলিশিং ব্যবস্থাকে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যান। প্রথমে তিনি সিলেট রেঞ্জের পৌর এলাকাগুলোতে বিট পুলিশিং চালু করেন। প্রত্যেক বিটের জন্য একজন এসআই ও এএসআইকে দায়িত্ব দেন। পরে প্রতিটি ইউনিয়নকে শহরের মতো একটি বিট হিসেবে গণ্য করে এসআই ও এএসআইদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দেন। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে পুলিশের জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে তাদের অফিসিয়ালি একটি মোবাইল নম্বরও দেওয়া হয়। বিট কর্মকর্তাদের তিনি নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ১৩টি দায়িত্ব চিহ্নিত করে সেগুলো পালনের নির্দেশনা দেন। বিট কর্মকর্তারা ইউনিয়নভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি বিরোধের তালিকা তৈরি করে সেগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন।

বিট পুলিশিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও সুসংহত ও সাধারণ মানুষকে আরও বেশি নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সেতুবন্ধন তথা সম্পর্কটা আরও জোরদার করার জন্য ডিএমপিতে আমরা এই বিট পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করি। এক্ষেত্রে থানা থেকেই প্রত্যেক এলাকার জন্য এসআই কিংবা এএসআই পদমর্যাদার বিট অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে থাকেন কয়েকজন কনস্টেবল। তাদের কাজ হচ্ছে, এই বিট এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় উপাসনালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল, অফিস বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে কিনা, সেগুলোর তালিকা তৈরি করা। একইসঙ্গে যারা অপরাধী থাকে কিংবা কী ধরনের অপরাধ করেন, তারা জামিনে এসে আবার সেই অপরাধ করেন কিনা, মাদক ব্যবসা চলে কিনা, সেগুলোর প্রতি লক্ষ রাখা।’

মাসুদুর রহমান আরও বলেন, ‘যখন আমরা কোনও মামলা রেকর্ড করি সেখানে উল্লেখ থাকে যে, ঘটনাস্থলটি থানা থেকে কতদূরে এবং কোন বিটে। শহরের ক্ষেত্রে এটাকে আমরা বিট হিসেবে চিহ্নিত করি। আর গ্রামের ক্ষেত্রে মামলায় বলা থাকে জেএল (জুরিসডিকশন লিস্ট) নম্বর। এটার উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘটনাটি কোথায় সংঘটিত হয়েছে, সেটা যেন আমরা সুচারুভাবে চিহ্নিত করতে পারি। পরবর্তী সময়ে তদন্তের ক্ষেত্রে এটি আমরা ব্যবহার করতে পারি। এছাড়া ছোট ছোট এলাকায় বিট করা থাকে বলে নজরদারি বাড়ানো যায়। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বাড়ানো যায়।’

বিট পুলিশিং নিয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে আলাদাভাবে কোনও তদারকি করা হয় না। পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের কাজের সুবিধার্থে ও আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে নিজের এলাকাকে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে কাজ করে থাকেন। সেটাই হচ্ছে বিট পুলিশিং। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের তদারক কর্মকর্তা সহেলী ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিট পুলিশিং আসলে কমিউনিটি পুলিশিংয়েরই একটি ছোট অংশ। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে আমরা থানা বা ওয়ার্ড ভাগ করে কাজ করছি। আর ডিএমপিসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের এলাকাকে ছোট ছোট ভাগ করে বিট করেছে। ডিএমপি মূলত এ কাজটা শুরু করে। যেমন দুটো পাড়া মিলিয়ে একটি বিট করা হয়েছে। আলাদা করে পুলিশ সদর দফতর থেকে বিট পুলিশিং মনিটরিং করা হয় না। এটা যার যার কাজের সুবিধার জন্য এলাকাগুলো ভাগ করে কাজ করছে।’

সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘কমিউনিটি পুলিশ যা করছে, তারাও মূলত সেই কাজটাই করছে। থানা পুলিশের কাজের সুবিধার্থে এটা করা হয়েছে। এটাকে মহল্লা পুলিশও বলা যেতে পারে। মূলত ক্লোজ মনিটরিংয়ের জন্যেই বিট করা হয়েছে। তাদের কাজ হচ্ছে জনগণের সমস্যাগুলো দেখা এবং অপরাধ দমনে তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া।’ মাদক, জঙ্গিবাদ, নারী নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে বিট পুলিশ কাজ করছে।

/এমএনএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ