স্কুল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া আনিলার হাতেই প্রধানমন্ত্রী তুলে দিলেন সাফল্যের পুরস্কার

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২১:০২, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩১, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯

জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে সাফল্যের পুরস্কার নিচ্ছেন আফিয়া কবীর আনিলা। (ছবি: ফোকাস বাংলা)

ছোটবেলাতেই একের পর এক স্কুল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে,কোথাও ভর্তি হতে পারলেও ক্লাস করতে দেওয়া হয়েছে বাথরুমের পাশে, কোথাও কোথাও অন্য শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা মানবে না বলে ভর্তি করার পরও বের করে দেওয়া হয়েছে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত আফিয়া কবীর আনিলাকে। অথচ সেই আনিলা সব প্রতিকূলতাকে জয় করে, প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে প্রতিবন্ধী দিবসে পেয়েছেন তার অবদানের পুরস্কার। তাকে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন কেমন লাগছে জানতে চাইলে একরাশ হাসি মুখে নিয়ে আনিলা বলেন, “ফেসবুক দেখছিলাম, এত এত উইশ, সকাল বেলায় পেপারেও ছবি এসেছে,ভালো লাগছে, আমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল এই সম্মাননা পাওয়ার’।

আনিলার বাসায় গিয়ে কথা হয় আনিলার বাবা আশফাক-উল-কবীর ও মা মারুফা হোসেনের সঙ্গে। তবে বাবা-মাকে থামিয়ে দিয়ে একসময় নিজের সংগ্রামের কথা নিজেই বলতে থাকেন আনিলা।

তার বাবা-মা জানান, ছোটবেলা থেকেই আনিলা কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে,দেশে এবং বিদেশে থাকা এসব শিশুর বাবা-মায়েদের এবিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে। তবে জার্নিটা মোটেও সুখকর ছিল না, হোঁচট খেতে হয়েছে বারবার। কিন্তু থেমে যাননি, তারাসহ কয়েকজন শিক্ষককে পাশে পেয়েছেন, সবার উৎসাহ আর ভালোবাসায় এই পথ পাড়ি দিয়েছে তাদের মেয়ে আনিলা।

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পুরস্কার আর সনদপত্র হাতে আনিলা

তারা আরও জানান, ২০১১ সালে অল্প বয়সেই সেভ দ্য চিলড্রেন ইউকে-র গ্লোবাল প্যানেল এর সদস্য ছিল আনিলা এবং তখন থেকেই তার কাজ শুরু হয়। সেভ দ্য চিলড্রেনের এক মিটিংয়ে লন্ডনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১২ জন কিশোর কিশোরী যায়। সেখানে আনিলাসহ আরেকজন ছিল বাংলাদেশের। সেসময় সেভ দ্য চিলড্রেনের ডিজঅ্যাবলদের শিক্ষা নিয়ে কোনও কাজ ছিল না। তখন সেখানে আনিলা এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলে এবং এরপরই সংস্থাটি এ বিষয়ে বিশ্বজুড়ে কাজ শুরু করে। তারপর থেকে আনিলা ভারত, মালয়েশিয়া, ভুটান,থাইল্যান্ডে গিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ে কাজ করেছে,কথা বলেছে,পেয়েছে বেশকিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

তার বাবা-মা জানান, প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা তরী ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গ্রামে গ্রামে গিয়ে আনিলা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের বাবা-মায়েদের উদ্দেশে কথা বলে আনিলা, তাদের সচেতন করেন। তাদের এসব সন্তানদের অধিকার নিয়ে কথা বলে এদের অবহেলা না করার আহ্বান জানায় তার মেয়ে। তখন থেকেই শুরু, এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ শুরু হয়।

আনিলার কথা শুনছেন বাংলাদেশের অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল।

আনিলার কাজ নিয়ে কথা বলতে বলতেই পাশের ঘর থেকে সে জানতে চায়, কোন কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে। তারপরই তাকে নিয়ে আসা হয় বসার ঘরে। এরপর শুরু হয় আনিলার সাথে কথা, সে নিজেই জানায় তার চলার পথে কত বাধা ছিল, সেসব কী করে অতিক্রম করেছে, প্রতিবন্ধী মানুষদের আমাদের দেশে কী চোখে দেখা হয়, বিভিন্ন স্কুলে তাকে কীভাবে হয়রানি করা হয়েছে। একইসঙ্গে তার প্রতি অন্যদের ভালোবাসার কথাও জানান আনিলা।

আনিলা বলেন, ছোটবেলাতে নানা স্কুলে ভর্তি হতে না পারার কষ্ট রয়েছে। নাম ধরে ধরে আনিলা বলেন, আমার ইন্টারভিউ নিলেন তারা, ইন্টারভিউ ভালো হলো, অথচ তারা আমাকে রিফিউজ করে দিলেন, কোথাও বাথরুমের পাশে ক্লাস করতে দিয়েছে, পরে আমাকে বের করে দিল। এভাবে একের পর এক রাজধানীর নামকরা বিভিন্ন স্কুলের অভিজ্ঞতা বলতে থাকেন তিনি। তবে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার সাথেও আনিলার ঝুলিতে রয়েছে কয়েকজন শিক্ষকের ভালোবাসা। “পুরস্কার পাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আমার শিক্ষকদের মুখ দেখে। পুরস্কার পাচ্ছি এটা তাদের যখন বললাম একথা তখন তারা যে এক্সপ্রেশন দিলো-আনবিলিভেবল, আমার তখনি পুরস্কার পাওয়া হয়ে গেছে। আমার শিক্ষক, রাজ্জাক স্যার-যার হাতে বড় হয়েছি, বাবুল কুমার বিশ্বাস স্যার-উনি আমার লাইফ চেঞ্জ করে দিয়েছেন,সুমন স্যার-তারা আমাকে খুব সাপোর্ট করেন, ভীষণ আদর করেন।’ এসব শিক্ষকের কাছে আনিলা ক্লাস এইট থেকে কোচিং শুরু করেন।

বাবা-মায়ের সঙ্গে আনিলা 

আনিলা বলেন, সবাইকে পড়াশোনা করাতে হবে, প্রতিবন্ধী সন্তানদের ঘরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা যাবে না, ঘরের বাইরে বের করে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে, সুযোগ পেলে আমরাও অনেক কিছু করতে পারি।

আনিলাকে নিয়ে যুদ্ধটা কতোটা কঠিন ছিল জানতে চাইলে মারুফা হোসেন বলেন, দুই সন্তান মারা যাওয়ার পর আনিলার জন্ম ভারতে। দেশে আসার একমাস পরে আবার ফলোআপে ভারত যান তারা। সেখানে আলট্রাসনোগ্রাম দেওয়া হলো, রিপোর্ট দেখার পর চিকিৎসক কেবল বললেন, ওর বোধহয় একটু সমস্যা রয়েছে। কিছু টেস্ট করাতে হবে, ভালো চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

দেশে আসার পর একের পর এক চিকিৎসকের কাছে গিয়েছেন এই দম্পতি, তবে সমস্যার সমাধান হয়নি। আবার আটমাস পর তারা ভারতে যান, সেখানে ডায়াগনোসিসে জানা গেলো আনিলা সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। সেখানে তারা চিকিৎসা দিলেন এবং তারাই সিআরপির নাম বলে দিলেন। এরপর একজন নিউরোলজিস্টের কাছে যাওয়ার পর তার ওষুধ শুরু হলো। ফিজিওথেরাপি শুরু হলো। এরই মধ্যে আনিলার এক বছর হলো। তখন তিনি গেলেন সিআরপিতে। সেখানে মাদার-চাইল্ড বিভাগ আছে, সেখানে ১৫ দিন ভর্তি থেকে আনিলার সবকিছু বোঝার চেষ্টা করলেন তিনি।

এরপরই আসলে আমাদের জার্নিটা শুরু। দেশে আমরা কারও কাছ থেকে পরিষ্কার কোনও ধারণা পাইনি। আমার সন্তানের কী সমস্যা, কী করতে হবে–সেটা কেউ আমাদের বুঝিয়ে বলেননি, এই কথাটা বুঝতে আমার দীর্ঘদিন চলে গেছে, আমি কিছুই জানতাম না। তাই উনারা যা যা বলতেন আমি তাই করতাম,অনেকটা প্রেসক্রিপশন দেখে কেবল ওষুধ খাওয়ার মতো। ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি চলছিল।

মারুফা হোসেন বলেন, ভারতে একজন সাইকোলজিস্ট আমাকে বলেছিলেন, ওর সঙ্গে প্রচুর কথা বলতে হবে। এই বিষয়টি আনিলার আট মাস বয়স থেকে আজ  অবধি ছাড়িনি। আমি ওর সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, বলতাম,আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, আমি আকাশ দেখতাম, বলতাম, বাবু আমরা আকাশ দেখিছি। কথা বলতাম, এবং প্রতিটি মুভমেন্টে ওকে জানাতাম, আমরা কী কী করছি। যার কারণে  ওর অন্যান্য সবকিছু ঠিক সময়ে হলেও ফিজিক্যালি সে পিছিয়ে ছিল। ওর ব্রেনের যে জায়গাটা ড্যামেজ হয়েছিল সেটা এতোটাই সমস্যা ছিল ফিজিওথেরাপি করেও ওকে হাঁটার পর্যায়ে আনতে পারিনি।আমাদের হয়তো তিনবেলা ভাত খাওয়া দেরি হতো,কিন্তু, থেরাপিতে কখনও দেরি হয়নি, স্টপ করিনি।

মেয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি  বলেন, আনিলার বয়স যখন তিন বছর তখন স্কুলে দিতে চাইলাম।বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের স্কুল কল্যাণীতে গেলাম। কিন্তু তখন সেখানে যে চিকিৎসক ছিলেন তিনি আমাকে এমন কথা শুনিয়েছেন যে, সেখান থেকে আমি অথবার কোনও মায়ের উঠে দাঁড়িয়ে ফিরে আসার মতো অবস্থা ছিল না। যেটা হয়তো ওরকম একটি জায়গাতে যিনি চিকিৎসক হিসেবে বসেছিলেন তার একটা ওরিয়েন্টেশন থাকা উচিত ছিল্, কিন্তু তিনি সে ব্যবহারটা আমার সঙ্গে করেননি। এরকম প্রচুর ধাক্কা, প্রতি পদে পদে ধাক্কা খেয়েছি এবং শিখেছি। 

তবে কল্যাণীর কাছে ঋণী এ কারণে যে সেসময়ে আনিলার যেসব শিক্ষক ছিলেন যেমন-কামরুন আপা, রাবেয়া আপা এবং রোমেলা আপা তারা আমাকে নতুন পথ দেখিয়েছিলেন। তারা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এ বিষয়ে লেখাপড়া করতে। আমি তখন সে চ্যালেঞ্জ নেই, বাচ্চার জন্যতো পড়লামই, একইসঙ্গে মনে হলো, এসব বাচ্চার জন্য কাজ করা যায়। সেই শুরু হলো-এভাবেই স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন এর শুরু ২০০৪ সালে।

ওকে এখানে প্রস্তুত করলাম রেগুলার স্কুলের জন্য। কিন্তু আজ থেকে ১৭ বছর আগে এটা ভীষণ ভীষণভাবে কঠিন ছিল। কারণ, তখনতো এখনকার মতো সচেতনতা ছিল না, প্রচার ছিল না। স্কুলগুলো তৈরি ছিল না, আসলে স্কুলগুলো এখনও তৈরি না। এই যে  যুদ্ধগুলো, সংগ্রামগুলো চলছে তো চলছেই। আনিলা তখন বিভিন্ন স্কুলে ইন্টারভিউ দিলো, এমন কোনও স্কুল নেই যেখানে আমরা যাইনি-কিন্তু প্রতিটি জায়গাতে আমাদের বলেছে হবে না এবং আমার মেয়েটাকে নেয়নি। আমার মেয়েটা একটা ভালো স্কুলে পড়তে পারে নাই-এটা আনিলার যেমন একটা বড় দুঃখ তেমনি আমাদেরও। অথচ পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি শিক্ষা-সেটা আমি ওকে দিতে পারিনি। আমরা আমাদের সবকিছু বদলে ফেলেছি মেয়ের জন্য, নতুন করে জীবন শুরু করেছি আমি এবং ওর বাবা। কেবলমাত্র মেয়েটাকে একটি স্বস্তির জায়গা দেব বলে, কারণ পরিবার থেকে যতটুকু দেওয়া প্রয়োজন তার পুরোটা দিলেও আশেপাশের মানুষ,সমাজের আরও অনেকের যে এগিয়ে আসতে হয় সেই সহযোগিতা আমরা পাইনি। সেটা করতে পারলে ওদের জায়গাগুলো আরও স্বস্তির হতো।

মায়ের সঙ্গে উচ্ছ্বাসে আবেগে আনিলা

তারপরও যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন আনিলার বাবা-মা। বাংলা মিডিয়ামে অনেক পরীক্ষার কথা ভেবে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়েছেন। কিন্তু সেখানেও ভোগান্তির শেষ ছিল না। তবে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করেও আনিলা এ লেভেল পাস করেছে। এরপর শুরু হয় আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধ। এমন কোনও বিশ্ববিদ্যালয় পাননি তারা যেখানে মেয়েকে ভর্তি করাতে পারেন।

সবশেষে আনিলা ভর্তি হয়েছেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে।

মারুফা হোসেন বলেন,এই হচ্ছে আমাদের হোঁচট খাওয়া এবং উঠে দাঁড়ানোর গল্প। তবে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পরে যাওয়ার পর যদি উঠে দাঁড়ানো না যায়, তাহলে আমি বলবো সেটাই হচ্ছে হার মানা। যদি আমি সন্তানের হাসিমুখ দেখতে চাই তাহলে সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মাকেও ড্রাইভ দিতে হবে, শক্তি সঞ্চয় করতে হবে সন্তানকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।  

 

/জেএ/টিএন/

লাইভ

টপ