সেবার মান বেড়েছে, মুনাফাও অব্যাহত থাকবে: বিমান এমডি

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ২০:৩৫, জানুয়ারি ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৫, জানুয়ারি ০৪, ২০২০

মোকাব্বির হোসেন৪৮ বছর পার করে আজ শনিবার (৪ জানুয়ারি) ৪৯-এ পা দিলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের এই দিনে যাত্রা শুরু করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত এই এয়ারলাইনস। তবে যাত্রা শুরুর এত বছর পরও নানা কারণে ভাবমূর্তি সংকটে এয়ারলাইনসটি। লোকসান, দুর্নীতি, নিম্নমানের যাত্রীসেবা নিয়ে বারবার সমালোচিত হয়েছে বিমান। তবে সরকারের উদ্যোগে বর্তমানে এর বহরে ১৮টি উড়োজাহাজ যুক্ত হয়েছে, চালু হচ্ছে নতুন নতুন রুট। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিমান মুনাফা করেছে ২১৮ কোটি টাকা। সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি মুনাফার ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোকাব্বির হোসেন। বিমানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার (২ জানুয়ারি) বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
বাংলা ট্রিবিউন: উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়েছে। রুটের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ফ্লাইট নিয়ে পরিকল্পনা কী?
মোকাব্বির হোসেন: আমাদের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়েছে। আমরা দিল্লি ও মদিনা ফ্লাইট শুরু করেছি। দিল্লিতে সপ্তাহে ৪ দিন ফ্লাইট ছিল, এখন ৭ দিনই ফ্লাইট যাবে। ম্যানচেস্টারে শুরু হচ্ছে। খুব শিগগির চীনের গোয়াংজু ও ভারতের চেন্নাই রুটে ফ্লাইট শুরু করবো। চীনের একটা টিম ভিজিটে আসছে, তাদের ভিজিট শেষে কার্যক্রম শুরু হবে। চেন্নাইয়ে আমাদের অফিসের কাজ শেষ হলে শুরু করা সম্ভব হবে।
ম্যানচেস্টার থেকে অনওয়ার্ড টরেন্টো এবং জিএফকে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা থেকে ব্যাংকক হয়ে জাপান রুটে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনাও আছে। এছাড়া, ইস্তাম্বুলের সঙ্গে অনওয়ার্ড কানেকটিভিটি বাড়াতে আমাদের পরিকল্পনা আছে। সেখানে অনওয়ার্ড কোড শেয়ারিং যাত্রীদের অন্য গন্তব্যে নেওয়া যাবে। এছাড়া পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ফ্লাইট ছাড়াও অন্য গন্তব্যের সঙ্গে সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও আমাদের আছে।
বাংলা ট্রিবিউন: গত অর্থবছরে বিমান ২১৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে বলা হচ্ছে। অন্যদিকে বিমানের বকেয়া হাজার কোটি টাকা। বকেয়া থাকার পর মুনাফা কোন প্রক্রিয়ায়?
মোকাব্বির হোসেন: যে বকেয়া আছে তা ২০১৬ সালের আগের। এরপর নিয়মিত সিভিল এভিয়েশন ও পদ্মা ওয়েলের টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। যতগুলো উড়োজাহাজ কেনা হয়েছে, সেগুলোর কিস্তিও পরিশোধ করা হয়েছে। অতীতের হাজার কোটি টাকা এক বছরে আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। সিভিল এভিয়েশন ও পদ্মা ওয়েলের বকেয়া কী পদ্ধতিতে পরিশোধ করা সম্ভব, তা পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। তবে বিমানের মুনাফা নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগ নেই। আমরা অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অডিট শেষে মুনাফা ঘোষণা করেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: মুনাফার ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবেন?
মোকাব্বির হোসেন: খরচ কমানো ও সাশ্রয়ী করার চেষ্টা করছি। নতুন রুট বাড়িয়ে গ্রাহক বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। আয়ের পথে যেসব বাধা আছে, সেগুলো দূর করছি।
বাংলা ট্রিবিউন: শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং দরপত্রের মাধ্যমে উন্মুক্ত করা হবে। বিমান এ পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবে?
মোকাব্বির হোসেন: আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অটোমেশনে করার চেষ্টা করছি। জনবলকে প্রস্তুত করছি। বর্তমান টার্মিনালে আমরা অটোমেটেড হতে পারবো না। এ বছরের মধ্যে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনবো। আমাদের আশা তৃতীয় টার্মিনালে আমরা হ্যান্ডলিং করতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: বিমানের কার্গো পরিবহন পরিস্থিতি এখন কেমন? প্রধানমন্ত্রী কার্গো উড়োজাহাজ কেনার কথা বলছেন। এ বিষয়ে অগ্রগতি কতটা?
মোকাব্বির হোসেন: শেষ তিন মাসে কার্গো পরিবহন কমেছে। কার্গো পণ্য সমুদ্রপথে যাচ্ছে, কিছু সড়কপথে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে কার্গোতে কিছু চার্জ আছে যা বেশি, কিন্তু ইন্ডিয়ায় কম। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।
এককভাবে ফ্রেইটার সার্ভিস দেওয়ার অভিজ্ঞতা বিমানের নেই। আমরা দুটো কাজ করছি, ফিজিবিলিটি স্টাডিতে অনেক বিষয় আছে। কার্গোর অপারেশনের জন্য গ্রাহক কোথায় পাওয়া যাবে, কী পরিমাণ মালামাল পাওয়া যাবে। আমরা অপারেশন কীভাবে করবো। কীভাবে আমরা মুনাফা করতে পারবো, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমাদের সর্তকভাবে এগোতে হচ্ছে, তা না হলে ফেল করার ঝুঁকি আছে। কেনা হয়ে গেলে কার্গো উড়োজাহাজ অন্য কাজে ব্যবহারও করা যাবে না।
বাংলা ট্রিবিউন: অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ফ্লাইট বৃদ্ধির কোনও পরিকল্পনা আছে কি? অন্য এয়ারলাইনসগুলোর অভিযোগ বিমানের ভাড়া প্রতিযোগিতামূলক নয়।
মোকাব্বির হোসেন: অভ্যন্তরীণ রুটে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকার কারণে বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ ব্যবহার করতে হচ্ছে। ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজগুলো এলে তখন সেগুলো অভ্যন্তরীণ রুটে চলবে। বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজগুলো তখন দূরপাল্লার গন্তব্যে ব্যবহার সম্ভব হবে। এছাড়া সকাল-বিকাল ফ্লাইটের ডিমান্ড আছে, সেটাও আমরা পারবো।
আমরা প্রাইস কাছাকাছি নিয়ে আসছি। আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলাম। কারণ, এজেন্টকে সবাই ৭ শতাংশ কমিশন দেয়। আমাদের টিকিটের দাম কম তাই বিক্রি করলে কম কমিশন। এ কারণে এজেন্টরা অন্য এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রি করতো। অপারেটিং লোকসান দিয়ে আমরা ফ্লাইট চালাতে পারবো না।
বাংলা ট্রিবিউন: বিমানের টিকিট বিক্রি নিয়ে অনিয়ম রোধে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
মোকাব্বির হোসেন: আমরা অ্যাপস চালু করেছি। অ্যাপসে ১০ শতাংশ ছাড়ে সারাবছর বিক্রি হবে। আমাদের টার্গেট যাত্রীরা সরাসরি সেবা ক্রয় করুক। একই সঙ্গে অনলাইন চেকইন, সিট অ্যালোকেশন সুবিধাও আমরা শিগগির চালু করবো। আমরা আশবাদী এক বছর পরে অ্যাপসে টিকিট কাটার পরিমাণ ৩০ শতাংশ বাড়বে।
টিকিট বিক্রি অনলাইন করতে টোটাল সিস্টেম চেঞ্জ করতে আরও ৬ মাস লাগবে। এসআইটিএ বা সিটা সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসলে আমরা জিডিএস (গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম) থেকে বের হয়ে আসতে পারবো। এজেন্সিগুলোর অনৈতিক বুকিং বন্ধ করতে মনিটরিং করছি। বেশ কিছু এজেন্সির লাইসেন্স সরকার বাতিলও করেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
মোকাব্বির হোসেন: বিমানের লম্বা সময় ধরে কোনও নিয়োগ হয়নি, পদোন্নতি হয়নি। ফলে এখন যারা অবসরে যাচ্ছেন তাদের রিপ্লেসমেন্ট নেই। যন্ত্রপাতি হয়তো কিনে এনে স্থাপন সম্ভব। কিন্তু দক্ষ জনশক্তি রাতারাতি পাওয়া সম্ভব নয়। ওপরের দিকে অফিসার লেভেলে যারা অবসরে যাচ্ছেন তাদের রিপ্লেসমেন্ট রেডি নেই। পরিচালক পদে সরকারের সহায়তায় বাইরে থেকে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সব পদে এভাবে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।
বাংলা ট্রিবিউন: ফ্লাইট অনটাইম রাখতে আপনাদের উদ্যোগ কী?
মোকাব্বির হোসেন: এয়ারলাইনসের মূল হলো তিনটি বিষয়। অনটাইমে ফ্লাইট ছাড়া, সেফটি নিশ্চিত করা ও আতিথেয়তা। গত সেপ্টেম্বর থেকে বিমানের আবহাওয়া ও কারিগরি দুর্যোগের কবলে পড়া ছাড়া সব ফ্লাইট শতভাগ অন-টাইমে গেছে। দেশের বাইরেও যেন আমরা অনটাইম ফ্লাইট ছাড়তে পারি সে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। যেখানে জনবল কম সেখানে জনবল বাড়ানো হয়েছে। আমরা সিস্টেম ডেভেলপ করেছি, যাতে সবসময় অনটাইম ফ্লাইট ছাড়ে।
বাংলা ট্রিবিউন: বিমানে জয়েন করে অনেকে আবার চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। এ সমস্যা দূর করতে কী করণীয় বলে মনে করেন?
মোকাব্বির হোসেন: যারা এসেছেন জেনেশুনেই চাকরিতে এসেছেন। এত বছর নিয়োগ ছিল না, এজন্য সমস্যার সৃষ্টি। ক্যারিয়ার প্ল্যানিং-এ যেসব সমস্যা আছে তা সমাধানের চেষ্টা করছি।
বাংলা ট্রিবিউন: অনেক সময় ফ্লাইটের সময় পরিবর্তন হলে বিমানের পক্ষে কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ আছে। এটার কারণ কী?
মোকাব্বির হোসেন: এখানে অভিযোগ আংশিক সত্য। আমাদের কলসেন্টারে জনবল কম। সেখানে অটোমেশন করে আমরা রিঅ্যারেঞ্জ করছি। যাত্রীদেরও লিমিটেশন আছে, তারা যখন টিকিট কাউকে দিয়ে কাটেন, তখন যাত্রীর ফোন নম্বর থাকে না, ফলে যাত্রীদের আপডেট তথ্য দেওয়া যায় না। বিদেশ থেকে যারা আসেন, তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও প্রকট। অন্যদিকে বিমানবন্দরে যাত্রীরা হোল্ডিং লাউঞ্জে চলে যান তখন তাদের জন্য বিমান কর্মকর্তা থাকেন। আগে সমস্যা থাকলেও এখন আর নেই।
বাংলা ট্রিবিউন: সক্ষমতা অনুযায়ী বিমানের উড়োজাহাজগুলোর ব্যবহার কতটা সম্ভব হচ্ছে?
মোকাব্বির হোসেন: আমাদের বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ ছাড়া সব উড়োজাহাজ ১৫ ঘণ্টার বেশি ব্যবহার হচ্ছে। শুধু বোয়িং ৭৩৭ ব্যবহার সম্ভব হয় না, কারণ উড়োজাহাজগুলো অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবহার হয়। ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজগুলো বিমান বহরে যুক্ত হলে বোয়িংগুলোও সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে ধন্যবাদ।

মোকাব্বির হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ছবি: চৌধুরী আকবর হোসেন

/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ