এক বছরেও পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মালিকদের খুঁজে পায়নি পুলিশ

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ১৯:৪৭, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৫, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০

চুড়িহাট্টার সেই ভয়াবহ ট্রাজেডিরাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনার এক বছর পূর্ণ হতে চললেও ওই ভবনে যারা কেমিক্যাল গোডাউন করেছিল তাদের এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, ওই কেমিক্যাল গোডাউনটির নাম ছিল পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল। এর মালিক ও নির্বাহী পরিচালক মো. কাশিফ। আশির দশক থেকে বাংলাদেশে কসমেটিকস ও সুগন্ধি সামগ্রী আমদানি করা এই প্রতিষ্ঠানটিতে আরও মালিকানা রয়েছে ইমতিয়াজ আহমেদ ও মুজাম্মেল ইকবাল নামে আরও দুই ব্যক্তি ও তাদের পরিবার সদস্যদের। তবে গত এক বছরেও এই মালিকদেরও কোনও সন্ধান পায়নি পুলিশ।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৩২ মিনিট। পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড় তখনও জনাকীর্ণ। রাস্তার যানজটে আটকে ছিলেন অনেক মানুষ। এদের কারও কারও ছিল শহীদ মিনারে যাওয়ারও প্রস্তুতি। তখন হঠাৎ ওয়াহেদ ম্যানশনে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহূর্তে ভবনটিতে আগুন ধরে যায় ও কিছুক্ষণের মধ্যেই আশপাশের পাঁচটি ভবনে সে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় নারী ও শিশুসহ মোট ৭১ জন প্রাণ হারায়। নিহতদের মধ্যে জুম্মন নামে এক ব্যক্তির ছেলে আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এতে ভবন মালিক হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদকে আসামি করা হয়। আসামির তালিকায় রয়েছে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনও। ওয়াহিদ ম্যানশনের মালিক মো. হাসান ও সোহেলকে গ্রেফতার করা হলেও বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন।

পুরান ঢাকার চকবাজারের ওয়াহেদ ম্যানশন ও আশপাশের বাড়িতে কেমিক্যাল থেকে ছড়ানো আগুন নেভাতে অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

পুরান ঢাকার চকবাজারের ওয়াহেদ ম্যানশন ও আশেপাশের বাড়িতে কেমিক্যাল থেকে ছড়ানো আগুন নেভাতে অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন হাওলাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মামলায় আমরা ভবন মালিকদের অবহেলা, গোডাউন মালিকদের অবহেলা পেয়েছি। ভবন মালিক দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন। আর গোডাউন মালিকের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এদিকে নিহতদের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য হাতে না পাওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মওদুদ হাওলাদার। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহতদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আমরা এখনও পাইনি। এই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষঙ্গিক কিছু কাগজপত্র জোগাড় করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডিতে নিহত ৬৭ জনের ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। যেকোনও সময় তা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
চুড়িহাট্টায় নিহত ৭১ জনের মধ্যে ৪ জনের মরদেহ বিনা ময়নাতদন্তে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সোহেল মাহমুদ বলেন, প্রথম পর্যায়ে ৪৫ জনের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছিল। বাকি ২২ জনের ডিএনএ প্রোফাইলিং করে ১৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। বাকি তিনজনকে এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

আগুন নেভানোর পরে ধ্বংসস্তূপ

কাদের অবহেলায় চুড়িহাট্টায় আগুন?

চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আগুনের সূত্রপাত ও অন্যান্য কারণ অনুসন্ধান করতে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদফতর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পক্ষ থেকে পাঁচটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার কেমিক্যাল গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। পারফিউম, বডি স্প্রে বা এয়ার ফ্রেশনারের ক্যানে সুগন্ধি বিউটেন, আইসো বিউটেন, আইসো প্রোপাইল অ্যালকোহল, রেকটিফাইড স্পিরিট বিভিন্ন অনুপাতে মেশানো থাকে। এগুলো বাতাসে মিশেই ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় গ্যাস চেম্বার তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমত আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গোডাউন হিসেবে ফ্লোর ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদের বিরুদ্ধে। মামলার আসামিও করা হয়েছে তাদেরকে। অগ্নিকাণ্ডের জন্য তাদের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত, যারা গোডাউন করেছিল সেই পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালেরও দায় রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চকবাজার জোনে দায়িত্বরত পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে ভবন মালিক ও গোডাউন মালিকদের শুধু দায়ী করলে হবে না। এসব বিষয় তদারকির জন্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে। তারা ঠিকভাবে তদারকি করেননি। তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা উচিত। ভবন ও গোডাউন মালিক নিঃসন্দেহে দায়ী। তাদের বাইরে যারা তদারকির দায়িত্বে ছিলেন তাদেরও দায় রয়েছে।

আগুন নেভানোর পরে ধ্বংসস্তূপপুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরাতে চান না ব্যবসায়ীরা

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তদন্ত প্রতিবেদনে আগুনের সূত্রপাত কেমিক্যাল গোডাউনে উল্লেখ করা হলেও পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা তা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, আগুন লেগেছিল সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। আগুনের জন্য কেমিক্যাল দায়ী নয়। চুড়িহাট্টায় আগুনের পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, তাতে খুব একটা সুফল আসেনি। কিছু গোডাউন কেরানীগঞ্জের কেমিক্যাল পল্লিতে স্থানান্তর করা হলেও অধিকাংশ গোডাউন এখনও পুরান ঢাকায় রয়ে গেছে।

কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের নেতা গোলাম কিবরিয়া মোল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুরান ঢাকা থেকে আড়াই শতাধিক গোডাউন কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখানে শুধু শোরুমগুলো রয়ে গেছে।

তবে সরেজমিন দেখা গেছে, চকবাজার, মিটফোর্ডের বিভিন্ন মার্কেট, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, বেগমবাজার, চানখারপুল এলাকায় রয়েছে পারফিউম বডি-স্প্রেসহ বিভিন্ন কসমেটিকস আইটেমের কেমিক্যাল গোডাউন। কসমেটিকসের গোডাউন ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালের গোডাউনও রয়েছে এসব এলাকায়।

আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়িতবে চুড়িহাট্টায় আগুনের পর প্রকাশ্যে কেমিক্যাল বিক্রি কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, খোলা বাজারে দাহ্য পদার্থ এখন আর সেভাবে বিক্রি হয় না। বিভিন্নভাবে সেগুলো ঢেকে রাখা হয়। সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারলেও ক্রেতারা ঠিকই এসব দোকান খুঁজে পান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চকবাজারের কেমিক্যাল ব্যবসায়ী হাসানুল ইসলাম বলেন, কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে কোথায় নিয়ে যাবো? এটা নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমি আজ ছেড়ে যাবো। অন্যরা ঠিকই রয়ে যাবে। তখন শুধু আমার ব্যবসা বন্ধ হবে।

এদিকে, ভবন মালিকরা বেশি ভাড়া পাওয়ার লোভে তাদের বাসাবাড়ি কেমিক্যাল গোডাউন হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ইউসুফ নামে এক বাড়ির মালিক বলেন, আমার বাড়িতে কোনও কেমিক্যাল গোডাউন নেই। আমি ভাড়া দেইনি। অন্যরা ঠিকই দিচ্ছে। বাড়িতে কেমিক্যালের গোডাউন ভাড়া দিলে বেশি ভাড়া পাওয়া যায়।

/টিএইচ/জিএম/এসআই/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ